আমরা প্রতিদিন কি খাচ্ছি, এ প্রশ্ন বহু বছর ধরেই করা হচ্ছে। আমাদের প্রতিদিনের আহারে-ব্যবহারে যেসব খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্য গ্রহণ ও ব্যবহার করি, তার প্রায় সবই ভেজালযুক্ত। এমন কোনো খাদ্য ও পণ্য নেই যাতে ভেজাল নেই। মাছ, গোশত, তরিতরকারি, ফল-মূল, তেল, মশলা, দুধসহ শিশুখাদ্য এমনকি যে টুথপেস্ট ব্যবহার করা হয়, তাতেও ভেজাল রয়েছে। এইসব ভেজাল-নকল খাদ্য ও পণ্য গ্রহণ ও ব্যবহার করার কারণে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে জীবনবিনাশী রোগে। ক্যান্সার, হৃদরোগ, ডায়বেটিস, কিডনী, ফুসফুসের রোগসহ নানা ধরনের জটিল রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমনকি বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হচ্ছে। ভেজাল খাদ্য খেয়ে শিশুদের সুস্থ বিকাশ বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। রোগবালাই নিয়েই তারা বেড়ে উঠছে। ভবিষ্যত প্রজন্মের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জীবনের শুরুতেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। মানুষের যে গড় আয়ু, তা কমে যাচ্ছে। আমরা কী এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আছি। যে পণ্যেই হাত দেয়া হোক না কেন, সেটাতে কম-বেশি ভেজাল রয়েছে। বিশুদ্ধ খাদ্য ও নিত্যব্যহার্য পণ্য বলতে কিছু নেই।
নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্য ও খাবারেই ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান মেশানো হচ্ছে। মাছ-গোশতের পচন রোধে ক্ষতিকর ফরমালিন এবং চামড়া ট্যানারির বিষাক্ত ক্রোমিয়ামযুক্ত বর্জ্য মুরগির খাবারে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলমূল, শাকসবজি, কাঁচা ফল দ্রুত পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড ও ইথোফেন এবং তাজা দেখাতে বিষাক্ত রং ¯েপ্র করা হচ্ছে। মসলাপাতি, মরিচ ও হলুদের গুঁড়ায় ইটের গুঁড়া, কাঠের ভুসি এবং কাপড়ের বিষাক্ত টেক্সটাইল রং মিশানো হচ্ছে। বেকারি ও ফাস্টফুড নোংরা পরিবেশে উৎপাদন, নিষিদ্ধ হাইড্রোস ও পোড়া মবিল বা পাম অয়েল বারবার ব্যবহার করা হচ্ছে। ভায়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, সয়াবিন তেল, হাইড্রোজেন পারক্সাইড, শ্যা¤পু ও ডিটারজেন্ট দিয়ে কৃত্রিম দুধ তৈরি করা হচ্ছে। সম্প্রতি এর সাথে যুক্ত হয়েছে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি। শুধু টুথপেস্টেই নয়, দুধ, চিনি ও সোয়াবিন তেলেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এখন যে আনারসের সিজন চলছে, তাতেও ভেজাল রয়েছে।
বাজারে যেসব চমৎকার রংয়ের পাকা আনারস দেখা যায়, তার বেশিরভাগেই ভেজাল রয়েছে। আনারস দ্রুত পাকাতে ও সুন্দর রঙ আনতে ইথাইলিন বা ক্যালসিয়াম কার্বাইডের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। কলার ক্ষেত্রেও তাই ব্যবহার করা হয়। আমরা প্রতিদিন টেলিভিশনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বড় বড় নামিদামি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত হলুদ-মরিচ, জুস, টুথপেস্ট, কোমল পানীয় ইত্যাদির যে চটকদার ও আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখে ক্রয় করি, সেগুলোতেও ভেজাল রয়েছে। যে পণ্যেই হাত দেয়া হোক না কেন, তাতে কোনো না কোনো ভেজাল-নকল রয়েছে। এসব ভেজাল খাদ্য ও পণ্য গ্রহণ করে মানুষ শুধু জটিল রোগব্যাধিতেই আক্রান্ত হচ্ছে না, পরিবেশও দূষিত-বিষাক্ত হয়ে উঠছে। ভেজাল খাদ্যের কারণে তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে কর্মজীবীরা ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। চিকিৎসকের ফি, বিভিন্ন টেস্ট, ওষুধপত্র ক্রয়, অপারেশন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খরচ মেটাতে গিয়ে অসংখ্য সাধারণ পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। অসুস্থরা পরিবার, সমাজ ও দেশের বোঝায় পরিণত হচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের জেলা শহরগুলো যেন ওষুধের ফার্মেসি ও হাসপাতালের শহরে পরিণত হয়েছে। রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে ফার্মেসি ও হাসপাতাল নেই। বিশে^র কোথাও এমন চিত্র দেখা যায় না।
আমরা যদি মালয়েশিয়ার কথা ধরি, তাহলে দেখব, সেখানে ওষুধ কেনার জন্য সহজে ফার্মেসি খুঁজে পাওয়া যায় না। বাসা থেকে অনেক দূরে গিয়ে ফার্মেসি থেকে ওষুধ আনতে হয়। তাদের পরিবেশ ও খাদ্যব্যবস্থা এমন যা, সুস্থ থাকতে সহায়তা করে। ফলে তাদের রোগবালাই কম হয়। অলিগলিসহ সর্বত্র হাসপাতাল-ফার্মেসির প্রয়োজন পড়ে না। আমাদের দেশে বাসার নিচেই ফার্মেসি দেখা যায়। এর কারণ হচ্ছে, আমরা প্রতিদিন কোনো না কোনো শারিরীক সমস্যায় আক্রান্ত হই। এই অসুস্থতার অন্যতম কারণ খাদ্যের ভেজাল। অথচ উন্নত বিশ্বে এমনকি উন্নয়নশীল অনেক দেশে খাদ্যে ভেজাল ও নকল পণ্য উৎপাদনের বিষয়ে মৃত্যুদন্ডের মতো কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। তারা খাদ্যে ভেজাল দেয়ার কথা কল্পনাও করতে পারে না।
আমাদের দেশে জীবনধারনের খাদ্যপণ্য কবে বিশুদ্ধ হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বাজার যেভাবে ভেজালখাদ্যে সয়লাব হয়ে আছে, তা থেকে মুক্তির কোনো উপায় জানা নেই। অথচ খাদ্যে ভেজাল রোধে সিটি করপোরেশন, বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের যে বাজার তদারকি ও ভেজালবিরোধী অভিযান নেই এবং কোনো কাজ করছে না, তা দেদারছে ভেজাল খাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা থেকেই বোঝা যাচ্ছে। বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত ভেজাল খাদ্যপণ্য তাদের জ্ঞাতসারে থাকলেও তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে কখনো দেখা যায় না। এমনকি, নিয়মিত বাজার পরিদর্শন করতেও দেখা যায় না। তাহলে তারা কি কাজ করছে, তাদের কাজটা কি? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে বিশুদ্ধ পরিবেশ এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন, তার প্রভাব দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের ওপর পড়ছে বলে মনে হয় না। তাদের মধ্যে কোনো বিচলন দেখা যাচ্ছে না। যেখানে প্রধানমন্ত্রীর তাকিদ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়াচ্ছে না, সেখানে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হবে কীভাবে? আমরা মনে করি, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করা জরুরি। ছোট-বড় যে প্রতিষ্ঠান ভেজাল পণ্য উৎপাদান করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
মাঠ পর্যায়ে ভেজাল খাদ্য ও পণ্য শনাক্তে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। মানুষকে সচেতন করতে ভেজাল খাদ্যবিরোধী প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। ভেজাল খাদ্য চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া জানাতে হবে।