
আবু রায়হান : সাতক্ষীরায় কলারোয়া উপজেলার জালাবাবাদ ইউনিয়নের ভূমি সহকারী কর্মকর্তী নায়েব আশরাফুউজ্জামানের অঢেল সম্পদের পাহাড় গড়েছে। ভূমি অফিসের ঘুষ অনিয়ম দুর্নীতির মহাযজ্ঞতে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ যেন গলার কাটা নায়েব আশরাফুউজ্জামানের। অবৈধ সম্পদে রাজকীয় জীবনযাপন করেন। শহরের মুনজিতপুরের বাড়ি থেকে প্রাইভেটকারের কর্মস্থলে প্রতিদিন অফিস করেন।
আশরাফুউজ্জামানের পিতা ছিলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার রমজানগর ইউনিয়নের পাথরখোলা গ্রামের একজন সাধারণ কৃষক। ২০০৫ সালে ভূমি অফিসে চাকরি মেলে নায়েব আশরাফুউজ্জামানের তারপর থেকে পিছে ফিরে আর থাকাতে হয়নি। বর্তমানে সে কলারোয়া উপজেলার জালালাবাদ ইউনিয়নে ভূমি সহকারী কর্মকতা হিসাবে দায়িত্বে আছে।
সরজমিনে দেখা গেছে, আশরাফুউজ্জামানের সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোল মৌজায় মুনজিতপুরে কোটি টাকা মূল্যে দুইতলা আলিশান বাড়ি তৈরি , কাটিয়া মৌজায় কাটিয়া বাজারে কোটি টাকা মূল্যে একতলা বাড়ি ক্রয় করেছে। নিজ শুশুরের নামে শহরের সুলতানপুর মৌজায় ৬০ লাখ টাকায় ক্রয় করেছে ৫ শতক জমির আমবাগান। তাছাড়া তার গ্রামে শ্যামনগর উপজেলার রমজাননগর ইউনিয়নের পাথরখোলা গ্রমে ক্রয় করেছে কয়েক একর কৃষি জমি।
সরকারি চাকরির প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ভূমি অফিসে যোগদান করতে হয় গ্রেড ১৪ তম পদে ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা হিসাবে। গ্রেড ১৪ তম পদে শুরুতে বেতন পায় ১৮০০০ টাকা। ২০২৩ সালে পরবর্তীতে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হিসাবে পদায়ন পান নায়েব আশরাফুউজ্জামান গ্রেড নবম পদে। ২১ বছর চাকরিজীবনে ২০০৫ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৮ বছর বেতন ভাতা পেয়েছে গ্রেড ১৪ তম পদে। ২০২৩ সাল থেকে চলমান ২০২৬ সাল পর্যন্ত বেতন ভাতা পাচ্ছে নবম তম পদের স্কেল অনুযায়ী।
২১ বছরের চাকরি জীবনে সর্বসাকূল্যে ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ টাকা বেতন ভাতা উত্তোলন করলেও নায়েব আশরাফুউজ্জামানের দৃশ্যমান সম্পদের বাজার মূল্য ৭ থেকে ৮ কোটি টাকা। জনমনে প্রশ্ন একজন ভূমি অফিসের সহকারীর বিশাল আয়বহিভূর্ত অবৈধ সম্পদের রহস্য কোথায়?
ভূমি অপরাধে জড়িয়ে নায়েব আশরাফুউজ্জামান বিভিন্ন কর্মস্থলে গড়ে তুলেছিল নামজারি, খাজানা দাখিলার ঘুষের সিন্ডিকেট। খ তফসিল ভুক্ত জমি ইজারার নামে হাতিয়ে নিয়েছে লক্ষ লক্ষ টাকা।
সে আটুলিয়ার ভূমি অফিসে থাকতে নওয়াবেকী বাজারে পেরিফেরিভুক্ত জমি বন্দোবস্তা দেওয়ার নামে দোকান প্রতি প্লট বিক্রি করছেন ৪ থকে ৫ লাখ টাকা দরে।
আটুলিয়া ইউনিয়নে খোলপেটুয়া নদীর চর দখলকে ঘিরে গড়ে তুলেছে সক্রিয় প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে তার আপন ভাগিনা সুরুজ ও দালাল মেহেদী । অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো সরকারি নিলাম, বৈধ বন্দোবস্ত বা লিখিত অনুমোদনের প্রমাণ দেখাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নায়েবের ‘বিশ্বস্ত দালাল চক্র’ কোন কাজ করে না। এই চক্রের সদস্যরা প্লট নির্ধারণ, দখল বুঝিয়ে দেওয়া এবং লেনদেনের মধ্যস্থতা করেন। অভিযোগ রয়েছে, মৌখিক প্রতিশ্রুতি ও অনানুষ্ঠানিক কাগজপত্রের মাধ্যমে কোটি টাকার বাণিজ্য চলছে।
শ্যামনগর রমজানগরের বাসিন্দা মনি বলেন, নায়েব আশরাফুউজ্জামানের পিতার কিছু ছিল না।তার বাবা ছিল সাধারণ কৃষক। সে ভূমি অফিসে ঘুষখেয়ে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছে। শহরে ২/৩ টা বাড়ি ক্রয় করেছে। গ্রামে কয়েকবিঘা জমি কিনেছে। তার আপন ভাগিনা সুরুজ ও দালাল মেহেদীর মাধ্যমে নায়েব আশরাফুউজ্জামান ঘুষের টাকা লেনদেন করে।
ভুক্তভোগী আটুলিয়ার সাবেক মেম্বার আবুল বাশার বলেন, আমার থেকে দোকান বরাদ্দের নামে তিন লাখ টাকা নিয়েছে। আমি নিজে লাল শপিং ব্যাগে আটুলিয়া ভূমি অফিসে নায়েবর হাতে টাকা দিয়েছি। এখন দোকানঘর দেয়না টাকাও দেয়না। টাকা ফেরত চাইলে হুমকি ভয়ভীতি দেখায়। শ্যামনগরের সহকারী ভূমি কমিশনার সাথে নায়েবের যোগসাজশ রয়েছে।
নায়েব আশরাফুউজ্জামান ওপর মহলে টাকা দিয়ে সবসময় ভাল জায়গায় পোষ্টিং নেয়। সে নিজে মুখে বলে আমি টাকা সবাইকে ভাগ দিই আমাকে কেউ কিছু করতে পারবে না।
নাগরিক নেতা অধ্যাপক ইদ্রিস আলী বলেন, একজন ভূমি অফিসের কর্মচারী যার পিতা একজন কৃষক সে শহরে বিশালবহুল ২ টি বাড়ি ক্রয় করে কিভাবে। সে আলাউদ্দীনের আর্শ্চয প্রদীপ পেয়েছে। ভূমি অফিসের উদ্ধর্তন কর্মকর্তারা কি ঘুমিয়ে থাকে তাদের কাজ টা কি।একজন নায়েব রাতারাতি কোটিপতি বনে যায় তারা জানে না। জনসম্মুখে ঘুষখোর নায়েব আশরাফুউজ্জামানের শাস্তি দেওয়া হোক।সকল সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হোক।
আরেকভুক্তভোগী বলেন, খ তফশিল জমির জন্য নায়েব আশরাফুউজ্জামান ২ লাখ টাকা নিয়েছিলে। নায়েব আশরাফুউজ্জামানের ঘুষের টাকা লেনদেন করে দালাল মেহেদী একসময় ডিসি অফিসের ওমেদার ছিল।আশরাফুউজ্জামান ঘুষছাড়া কাজ করে না।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক আফরোজা আক্তার বলেন, নায়েব আশরাফুউজ্জামানের বিষয়ে শুনেছি। অনিয়ম দুর্নীতির কারণে নায়েব আশরাফুউজ্জামানকে বদলি করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক।
প্রশাসনের নীরবতা, তদন্তের দাবি অভিযোগ উঠলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো তদন্ত শুরু হয়নি বলে জানিয়েছে ভুক্তভোগীরা। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে একাধিক ভুক্তভেগীসহ সাতক্ষীরার সুশীল নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।