প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ৯:২২ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ৭:৩০ অপরাহ্ণ

জি,এম নজরুল ইসলাম: সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কুলতলী বাজারে আধুনিকতার নতুন আলো ছড়িয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের উদ্যোগ। অত্যাধুনিক সেন্সরযুক্ত ল্যাম্পপোস্টের আলোয় রাতের অন্ধকার ভেদ করে বাজারটি এখন ঝলমল করছে দিনের আলোর মতো। সন্ধ্যা নামলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলে উঠছে বাতিগুলো। ফলে সন্ধ্যার পরও স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাবেচা করতে পারছেন ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা। একই সঙ্গে বাজারকে একটি আধুনিক ও মডেল বাজারে রূপান্তরের প্রত্যাশাও ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
ব্র্যাকের CEIP প্রকল্পের GO-CREWSNCT উদ্যোগের আওতায় প্রাথমিক পর্যায়ে বাজারের চারপাশে স্থাপন করা হয়েছে ১০টি অত্যাধুনিক সেন্সর সিস্টেমযুক্ত ল্যাম্পপোস্ট। আলোকসজ্জার পাশাপাশি দোকানদারদের জন্য ফোল্ডিং টেবিল বিতরণ এবং বাজারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে ব্র্যাক। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কুলতলী বাজারের পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা ও ব্যবসা বাণিজ্যের ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।
আলোয় বদলে যাচ্ছে বাজারের চিত্র
একসময় সন্ধ্যার পর পর্যাপ্ত আলোর অভাবে বাজারে কেনাবেচা করতে নানা অসুবিধার মুখোমুখি হতে হতো ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের। বর্তমানে সেন্সরযুক্ত ল্যাম্পপোস্ট স্থাপনের ফলে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে। সন্ধ্যা নামতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলে ওঠা বাতির আলোয় বাজারের বিভিন্ন অংশ আলোকিত হয়ে উঠছে। দূরদূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ী ও ক্রেতারাও এখন রাতের বেলায় কেনাকাটা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন।
স্থানীয়দের মতে, বাজারের আলোকব্যবস্থার উন্নয়ন শুধু কেনাবেচার পরিবেশকেই সহজ করছে না, বরং একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত বাজার গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে।
দোকানদারদের জন্য ফোল্ডিং টেবিল দেওয়ার পরিকল্পনা
ব্র্যাকের এরিয়া ম্যানেজার কে এম আলী হাসান বলেন, এলাকার মানুষের সুবিধা নিশ্চিত করা এবং কুলতলী বাজারকে আধুনিক ও ডিজিটাল বাজার হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে বাজারে অত্যাধুনিক সেন্সরযুক্ত ল্যাম্পপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি বাজারের প্রত্যেক দোকানদারকে একটি করে ফোল্ডিং টেবিল দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব টেবিলের ওপর মালামাল সাজিয়ে রেখে তাঁরা সহজে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন।
তিনি আরও জানান, বাজারের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত রাখতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাজার পরিচালনা কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে বাজারের সার্বিক উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্র্যাকের এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ব্যবসায়ীরা পণ্য আরও সুশৃঙ্খলভাবে সাজিয়ে বিক্রি করার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের মাধ্যমে বাজারের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং ক্রেতাদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ তৈরির পথও সুগম হবে।
কুলতলী বাজারের উন্নয়নের পথে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজস্ব জমির অভাব। বাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি সুবিত কুমার মন্ডল বলেন, বাজারের নিজস্ব কোনো জায়গা না থাকায় অনেক উন্নয়নমূলক কাজ ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বাজারের জন্য জায়গা অধিগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে আমরা চিন্তাভাবনা করছি। আশা করি, সবকিছু ঠিকঠাকভাবে এগোলে বাজারের উন্নয়নে আরও কাজ করা সম্ভব হবে।
তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, বাজারের দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে স্থায়ী জায়গার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজস্ব জমি নিশ্চিত করা গেলে দোকানপাটের সুশৃঙ্খল বিন্যাস, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বাজারের জন্য জমির ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বাজার পরিচালনা কমিটি এবং এলাকাবাসী সম্মিলিতভাবে কার্যকর উদ্যোগ নেবেন।
কুলতলী বাজারের ব্যবসায়ী প্রমীলা কয়াল বলেন, আগে আমাদের মালামাল বিক্রি করতে তিন থেকে চার কিলোমিটার দূরের বাজারে যেতে হতো। এখন নিজেদের এলাকায় বাজার হওয়ায় আর দূরে যেতে হয় না। এতে আমাদের অনেক সময় বাঁচছে, পাশাপাশি মালামাল বহনের খরচও কমেছে।
তিনি মনে করেন, বাজারের আলোকব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে সন্ধ্যার পরও কেনাবেচা করার পরিবেশ আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ হয়েছে।
ক্রেতাদের মুখেও স্বস্তির হাসি
বাজারে কেনাকাটা করতে আসা গৌরাঙ্গ মন্ডল বলেন, আগে সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে অনেক দূরে যেতে হতো। এখন কাছেই বাজার হওয়ায় সেই কষ্ট আর করতে হচ্ছে না। এতে আমাদের সময় বাঁচছে, গাড়িভাড়াও লাগছে না। বাজারে আলো স্থাপন করায় রাতের বেলায় কেনাকাটা করতেও সুবিধা হচ্ছে।
স্থানীয় ক্রেতাদের মতে, কাছাকাছি বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সুযোগ তৈরি হওয়ায় তাঁদের দৈনন্দিন জীবন অনেক সহজ হয়েছে। এতে একদিকে যেমন সময় ও যাতায়াত ব্যয় কমছে, অন্যদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ীদেরও ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
একটি আধুনিক বাজারের পরিচয় কেবল আলোকসজ্জা কিংবা উন্নত অবকাঠামোতে সীমাবদ্ধ নয়, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সুশৃঙ্খল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্যসম্মত চলাচলব্যবস্থাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কুলতলী বাজারে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাজারের ময়লা আবর্জনা সঠিকভাবে সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে বাজারের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা, দুর্গন্ধ ও অপরিচ্ছন্নতা কমানো এবং ক্রেতা বিক্রেতাদের জন্য আরও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ গড়ে তোলা সহজ হবে।
এ ক্ষেত্রে বাজার পরিচালনা কমিটি, দোকানদার এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি। নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলা, নিয়মিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে এ উদ্যোগকে আরও কার্যকর করা সম্ভব।
একটি বাজার কেবল পণ্য কেনাবেচার স্থান নয়, এটি একটি এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ এবং জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তাই কুলতলী বাজারে আলোকব্যবস্থার উন্নয়ন, দোকানদারদের জন্য ফোল্ডিং টেবিল দেওয়ার পরিকল্পনা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগকে স্থানীয় উন্নয়নের ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন এলাকাবাসী।
তবে একটি পূর্ণাঙ্গ মডেল বাজার গড়ে তুলতে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজন পরিকল্পিত দোকানপাট, নিরাপদ চলাচল, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় ডিজিটাল সুবিধা। একই সঙ্গে বাজারের জন্য স্থায়ী জায়গার ব্যবস্থা করা গেলে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন আরও সহজ হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ব্র্যাকের উদ্যোগ, বাজার পরিচালনা কমিটির আন্তরিকতা এবং সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কুলতলী বাজার একদিন একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও জনবান্ধব বাজার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
রাতের অন্ধকারে জ্বলে ওঠা ল্যাম্পপোস্টের আলো তাই কেবল বাজারকে আলোকিত করছে না, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন, ক্রেতাদের স্বস্তি এবং একটি উন্নত বাজারব্যবস্থার প্রত্যাশা। এখন প্রয়োজন প্রাথমিক উদ্যোগগুলোকে বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, যাতে কুলতলী বাজারের এই আলোকিত যাত্রা টেকসই উন্নয়নের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।