
ইউপি সচিবরা মোস্তাফিজুরকে স্ট্যাম্প ক্রয় সংক্রান্তে নগদ অর্থ প্রদান করেছেন - প্রকৌশলী জাকির হোসেন
উপজেলা প্রকৌশলীর পত্রের স্বাক্ষর জাল করেছে বিপুল গং, আমার স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে - উপ সহকারী প্রকৌশলী মোঃ আবু সাইদ
দুই ইউপি চেয়ারম্যান ও তিন সচিবদের দাবী ঘুষ নয়, স্ট্যাম্প ক্রয় সংক্রান্তে মোস্তাফিজুরকে নগদ অর্থ প্রদান করা হয়
হাবিবুর রহমান : বৈধ অর্থকে ঘুষের টাকা বলে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা চালিয়েছে একটি চক্র। আর এই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন কালিগঞ্জ উপজেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অফিসের হিসাবরক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান। এই চক্রের সাথে জড়িত রয়েছেন সংশ্লিষ্ট অফিসের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। সাতনদীর অনুসন্ধানে এমনই তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কালিগঞ্জ উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে উপজেলা প্রকৌশল অফিস থেকে উন্নয়নমুলক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে মৌতলা ইউনিয়নের ১১টি প্রকল্প, কুশলিয়া ইউনিয়নের ২৩টি এবং চাম্পাফুলের ইউনিয়নের ৮টি প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
প্রত্যেকটি প্রকল্পের প্রকল্প কমিটির সভাপতি বিধি অনুসারে তিন’শ টাকার নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে উপজেলা প্রকৌশল কর্তৃপক্ষ বরাবর সম্পন্ন হওয়া কাজের দায়ভার গ্রহণ করে অঙ্গীকারনামা প্রদান করে থাকেন। এক্ষেত্রে প্রত্যেকটি প্রকল্পের জন্য তিন’শ টাকার নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প সরবরাহ করার নিয়ম প্রকল্প কমিটির সভাপতির।
তিনটি ইউনিয়নের সচিবরা ৪২টি প্রকল্প কমিটির সভাপতির নিকট থেকে ১৪,৭০০ টাকা সংগ্রহ করে তা হিসাবরক্ষক মোস্তাফিজুর রহমানের অফিস কক্ষে গিয়ে প্রদান করেন। অফিস কক্ষে থাকা সিসি ক্যামেরা এই টাকা প্রদানের ভিডিও চিত্র ধারণ করে।
পরে এই ভিডিও চিত্র গণমাধ্যম কর্মীদের হাতে চলে যায়। ভিডিও চিত্রে দেখা যায় মৌতলা ইউনিয়নের সচিব শেখ কামরুজ্জামান, কুশলিয়া ইউনিয়নের সচিব কামরুল ইসলাম ও চাম্পাফুল ইউনিয়নের সচিব সাইদুর রহমান হিসাবরক্ষক মোস্তাফিজুর রহমানের হাতে নগদ টাকা প্রদান করছেন। এই বৈধ অর্থ লেন-দেনকে ১৮ এপ্রিল শনিবার একাধিক গণমাধ্যমে কথিত ঘুষ লেন-দেন বলে প্রচার করা হয়েছে।
এই অপপ্রচারের সাথে সাথে সাতক্ষীরা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ২১ এপ্রিল কালিগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশল অফিসে গিয়ে গণমাধ্যমে প্রচার হওয়া ঘুষ লেন-দেন এর কথিত অভিযোগ প্রাথমিক ভাবে তদন্ত করেন। তদন্তকালে তিনি উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেন এবং অভিযুক্ত হিসাবরক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান এর কাছে ঘটনার বিষয়ে তথ্য নেন। এদিকে গণমাধ্যমে প্রচারিত ঘুষ লেন-দেনের ভিডিও চিত্র ছড়িয়ে পড়ায় এলজিইডি’র ঢাকাস্থ প্রধান প্রকৌশলী স্বাক্ষরিত এক পত্রে ২৭ এপ্রিল অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করেন।
যে চক্রের রোষানলে হিসাবরক্ষক মোস্তাফিজুর:
কালিগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশল অফিসের হিসাব সহকারী চঞ্চল কুমার দাশ বিপুল। এই বিপুলের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি চক্র কালিগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশল অফিসের কর্তাব্যক্তিকে জিম্মি করে গোটা অফিসকে কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এই চক্রের চাপে উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেন, হিসাবরক্ষক মোস্তাফিজুর রহমানের কালিগঞ্জে বদলি আদেশ বাতিল করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন)-ঢাকাকে ১৫ মে ২০২৫ তারিখে এক পত্র দেন। ওই পত্রের সাথে সংযুক্ত করা হয় ওই অফিসের ১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্বাক্ষরযুক্ত একটি তালিকা।
অফিসের অনেকের স্বাক্ষর জাল-জালিয়াতি করা হয়েছে যার ডকুমেন্ট সাতনদীর অনুসন্ধান টিমের হাতেও এসেছে। এই তালিকা প্রস্তুত করে হিসাব সহকারী চঞ্চল কুমার দাশ বিপুল। এই বিপুলই চায়নি হিসাবরক্ষক মোস্তাফিজুর কালিগঞ্জে যোগদান করুক। এর নেপথ্যের কারণ মোস্তাফিজুর রহমান যোগদান করলে বিপুলের কাজের পরিধি কমে যাবে।
বাধাগ্রস্ত হবে তার একচ্ছত্র ঘুষবাণিজ্য। একারণেই পরিকল্পনা মাফিক উপজেলা প্রকৌশলীকে ব্যবহার করে পথের কাটা সরাতে চেয়েছিলেন হিসাব সহকারী চঞ্চল কুমার দাশ বিপুল। কিন্তু সেযাত্রায় টিকে যায় মোস্তাফিজুর রহমান। যোগদান করেন কালিগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ে মোস্তাফিজুর রহমান।
বিপুলের নতুন ফন্দিতে কুপোকাত মোস্তাফিজুর:
উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেনের রুমে সিসি ক্যামেরা না থাকলেও অন্যান্য স্টাফদের রুমে আছে সিসি ক্যামেরা। তিনটি ইউনিয়ন পরিষদের সচিবদের নিকট থেকে স্ট্যাম্প ক্রয় বাবদ ১৪,৭০০ টাকা গ্রহণ করায় তা সিসি ক্যামেরায় রেকর্ড হয়। বিপুল সিসি ক্যামেরায় ধারণকৃত সেই ভিডিও চিত্র গণমাধ্যম কর্মীদের হাতে তুলে দেয়। কোন প্রকার যাচাই বাছাই ছাড়াই কথিত ঘুষ বাণিজ্যের ভিডিও চিত্র গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
অফিসের সংরক্ষিত সিসি ক্যামেরার ভিডিও চিত্র গণমাধ্যমে গেল কিভাবে?
একটি সরকারি অফিসের সিসি ক্যামেরার সংরক্ষিত ভিডিও চিত্র অন্য যে কোন পক্ষের হাতে যাওয়ার পূর্বে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি প্রয়োজন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ জানেন না অফিসের ভিডিও চিত্র গণমাধ্যমে গেল কিভাবে। অফিসের নিয়ন্ত্রতক বিপুলই এই ফুটেজ গণমাধ্যমে পৌছে দেন, যা গণমাধ্যমকর্মীদের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
প্রকৌশলীর কর্তৃক প্রদত্ত্ব পত্রের জাল-জালিয়াতি:
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) বরাবর উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেনের স্বাক্ষরিত প্রেরিত পত্রে জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। পত্রের সংগে সংযুক্ত কর্মকর্তা কর্মচারীদের নামের তালিকায় করা স্বাক্ষর দেখে অনেকে বিষ্ময় প্রকাশ করেছেন।
উপসহকারী প্রকৌশলী মোঃ আবু সাইদ সহ অনেকের দাবী তারা ওই পত্রে স্বাক্ষর করেন নাই। কে করেছেন তাও জানেন না। তবে একটি সূত্রের দাবী জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন চঞ্চল কুমার দাশ বিপুল।
মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘুষের টাকা নয়, স্ট্যাম্প ক্রয়ের টাকা দিয়েছি:
চাম্পাফুল ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ মোজাম্মেল হক মোজাম, সচিব মোঃ সাইদুর রহমান, মৌতলার চেয়ারম্যান মোঃ ফেরদাউস মোড়ল এবং সচিব শেখ কামরুজ্জামান ও কুশলিয়া ইউপির সচিব মোঃ কামরুল ইসলাম সাতনদীর সাথে এক ভিডিও সাক্ষাতকারে জানিয়েছেন, উপজেলা প্রকৌশল অফিসের হিসাবরক্ষক মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে স্ট্যাম ক্রয় সংক্রান্ত নগদ অর্থ দেয়া হয়েছে।
এটা ঘুষের টাকা নয়। গণমাধ্যমে কথিত ঘুষ লেন-দেনের যে ভিডিও চিত্র প্রচার হয়েছে তা অপপ্রচার। সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম কর্মীরা আমাদের সাথে কথা না বলে খবর প্রচার করেছেন যা অনৈতিকও বটে। আমাদের বক্তব্য নেয়া হলে সত্য বেরিয়ে আসতো।
কর্তৃপক্ষের মতামত:
কালিগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেন বলেছেন, ইউপি সচিবদের নিকট থেকে হিসাবরক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান স্ট্যাম্প ক্রয় বাবদ নগদ টাকা গ্রহণ করেছেন। ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ সত্য নয়।
অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্য :
হিসাবরক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান সাতনদীকে বলেন, যোগদানের পরও দপ্তরের চার্জ আমি বুঝে পায়নি। হিসাব সহকারীর অধিনেই কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে আমাকে। একটি পিন প্রয়োজন হলেও তার কাছ থেকে নিতে হতো। সে আমাকে সহ্য করতে পারতো না। গালাগাল পর্যন্ত দিয়েছে।
কর্তৃপক্ষ আমার দায়িত্ব হিসাব সহকারী চঞ্চল কুমার দাশ বিপুলকে দিয়ে করান। আমার বিরুদ্ধে কথিত ঘুষ লেন-দেনের যে ভিডিও চিত্র গণমাধ্যমে এসেছে তা সত্য নয়। ইউনিয়ন পরিষদের সচিবদের নিকট থেকে স্ট্যাম্প ক্রয় বাবদ নগদ ১৪,৭০০ টাকা গ্রহণ করেছি মাত্র।