শ্যামনগর প্রতিবেদক:সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের বাসিন্দা ফেরদৌস খান নিক্সনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা ও প্রশ্ন উঠেছে। ঢাকাস্থ সাতক্ষীরা ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং পদ্মপুকুরের ‘তরি মাদার ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচয় দেওয়া নিক্সন খান বর্তমানে পদ্মপুকুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবেও প্রচারণা চালাচ্ছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বিভিন্ন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব, সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাতের ছবি নিয়মিত প্রকাশ করতে দেখা যায়। এসব ছবির পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প, রাস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ স্থানীয় নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিজের যোগাযোগ, উদ্যোগ ও ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন তিনি।বিশেষ করে পদ্মপুকুর ও গাবুরা এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ‘কেয়ার রাস্তা’ নিয়ে তাঁর একাধিক ফেসবুক পোস্টে বিভিন্ন তথ্য ও দাবি উঠে এসেছে।
একটি পোস্টে তিনি দাবি করেন, পদ্মপুকুর ও গাবুরা ইউনিয়নের সড়কের বর্তমান অবস্থা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছে ছবি ও তথ্যসহ তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, খুলনার সংশ্লিষ্ট সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা রাস্তা সংস্কার বা উন্নয়নের জন্য প্রস্তাব তৈরি করে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছেন।অন্য একটি পোস্টে তিনি দাবি করেন, পদ্মপুকুর ইউনিয়নের চৌদ্দরশী ব্রিজ থেকে গাইনবাড়ি হয়ে বেতকাশী খেয়াঘাট পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়কের জন্য ২৩ কোটি টাকার একটি প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে তাঁর নিজের পোস্টেই উল্লেখ রয়েছে, প্রকল্পটি তখনও অনুমোদিত হয়নি এবং অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
নিক্সন খানের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তিনি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করে ওই সড়কের কাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। অনুমোদন হলে কয়েক মাসের মধ্যে কাজ শুরু হতে পারে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
শুধু রাস্তা নয়, পদ্মপুকুর এলাকার কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তি ও অনুমোদনের বিষয়েও নিজের ভূমিকার কথা ফেসবুক পোস্টে তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আবেদনের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে অনুমোদনের চিঠি সংগ্রহ এবং পরে তা স্থানীয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে জমা দিয়েছেন।
উন্নয়নকাজ, নাকি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রচারণা?
নিক্সন খানের এসব পোস্টকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব, অনুমোদন ও বাস্তবায়ন যেখানে নির্দিষ্ট সরকারি বিধি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, সেখানে কোনো ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ বা তদবির করলেই সেই প্রকল্পকে নিজের অর্জন হিসেবে প্রচার করা কতটা যৌক্তিক?
স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, উপকূলীয় প্রান্তিক অঞ্চলের জেলে, বাওয়ালি, কৃষক, চাষি, দিনমজুরসহ সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর রাস্তা, পানি, কৃষি, শিক্ষা ও জীবিকার নানা সমস্যায় ভুগছেন। এসব মানুষের সমস্যাকে সামনে রেখে সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করা অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে। কিন্তু সেই যোগাযোগকে কেন্দ্র করে নিজেকে এলাকার ‘বড় নেতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হলে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রী বা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাতের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে জনমনে নিজের প্রভাব ও রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে একটি বিশেষ ধারণা তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কেউ কেউ এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ‘দালালি’ বা ‘নেতাগিরির রাজনীতি’ হিসেবে সমালোচনা করছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সমালোচকদের প্রশ্ন, প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধি হওয়া কি শুধু মন্ত্রী-সচিবদের সঙ্গে ছবি তুলে ফেসবুকে প্রচারের মাধ্যমে প্রমাণ করা যায়, নাকি মাঠে জেলে-বাওয়ালি, কৃষক-চাষা ও দিনমজুর মানুষের পাশে থেকে তাদের অধিকার আদায়ের ধারাবাহিক সংগ্রামের মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে হয়?
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, প্রকল্পের প্রকৃত অবস্থা কোথায়?
পদ্মপুকুরের কেয়ার রাস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে নিক্সন খানের ফেসবুক পোস্টে যেসব তথ্য দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর প্রকৃত অগ্রগতি জানতে সরকারি নথি যাচাই করা জরুরি।
কারণ কোনো প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি হওয়া, দপ্তরে পাঠানো, অনুমোদন পাওয়া, অর্থ বরাদ্দ হওয়া এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন—প্রতিটি ধাপ আলাদা। কোনো প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন থাকলেই সেটি অনুমোদিত প্রকল্প হয়ে যায় না।
এ কারণে সংশ্লিষ্ট সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নথি থেকে প্রকল্পগুলোর প্রকৃত অবস্থা, অনুমোদন, বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি যাচাই করা প্রয়োজন।‘দালালি’ নয়, জবাবদিহি চান স্থানীয়রা
স্থানীয়দের ভাষ্য, উপকূলীয় পদ্মপুকুরের মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হচ্ছে বাস্তব উন্নয়ন—নিরাপদ ও টেকসই রাস্তা, সুপেয় পানি, কৃষির সুরক্ষা, জেলে-বাওয়ালিদের জীবিকার নিশ্চয়তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন।তাদের প্রশ্ন, কোনো ব্যক্তি যদি সত্যিই এলাকার উন্নয়নের জন্য কাজ করে থাকেন, তাহলে সেই কাজের স্বচ্ছ প্রমাণ সরকারি নথিতে থাকা উচিত।ফেসবুকের পোস্ট, মন্ত্রী-সচিবদের সঙ্গে ছবি কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে প্রকল্পের সরকারি অনুমোদন, বরাদ্দ এবং বাস্তবায়নই হওয়া উচিত সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি—এমন মত স্থানীয়দের একটি অংশের।
অন্যদিকে নিক্সন খানের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি কোনো সরকারি পদ বা ক্ষমতার দাবি করছেন না। এলাকার মানুষের স্বার্থে বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করে উন্নয়নকাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলেই তিনি দাবি করেন। তাঁর ফেসবুক পোস্টেও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করার কথা উল্লেখ রয়েছে।
ফলে নিক্সন খানের বিরুদ্ধে ওঠা ‘দালালি’, ‘নেতাগিরি’ কিংবা সরকারি প্রকল্পকে ব্যক্তিগত কৃতিত্ব হিসেবে প্রচারের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তাঁর বক্তব্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের নথি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদনে উন্নয়ন প্রকল্প ও সরকারি যোগাযোগসংক্রান্ত যেসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো নিক্সন খানের নিজের ফেসবুক পোস্টে করা দাবির ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে।