
শনিবার (২৪ অক্টোবর) খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) লাইন্সে কমিউনিটি পুলিশিংবিষয়ক সুধী সমাবেশ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইজিপির বক্তব্যে উঠে আসে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধ দমনের কৌশল এবং পুলিশের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক পুনর্গঠনের বিষয়গুলো।
আইজিপি বলেন, গত ১৭ বছরে বিভিন্ন কার্যক্রমের কারণে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে একধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। সেই হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় পুলিশকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর লক্ষ্যেই তাঁর খুলনা সফর।
আইন প্রয়োগে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের বিষয়টি তুলে ধরে আইজিপি বলেন, বলপ্রয়োগ করলে এক পক্ষ পুলিশকে ফ্যাসিস্ট আখ্যা দেয়, আর বলপ্রয়োগ না করলে পুলিশের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তিনি বলেন, তাঁরা এ ধরনের দ্বিমুখী পরিস্থিতি দেখতে চান না।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অপরাধ দমনে পুলিশের ক্ষমতা প্রয়োগের পাশাপাশি দায়িত্বশীলতা ও জনআস্থার বিষয়টিও সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সঙ্গে নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, আইজিপির বক্তব্যে সেই প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তাবের কথা জানিয়ে আইজিপি বলেন, অনেক সময় প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা তাঁদের আশ্রয়ে থাকা ব্যক্তিরা চাঁদাবাজিতে জড়িত থাকেন। ভয়ে সাধারণ মানুষ অভিযোগ করতে বা সাক্ষ্য দিতে চান না।
তিনি জানান, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে পুলিশ যাতে নিজ উদ্যোগে মামলা করে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে, সেই সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেলে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
তবে নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হওয়ার আগে এর চূড়ান্ত বিধান, প্রয়োগের সীমা এবং কার্যকর হওয়ার সময়সীমা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার পরও কেউ কেউ জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন বলে মন্তব্য করেন আইজিপি। এ ধরনের অপরাধ স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
মাদক, কিশোর গ্যাং, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুলিশের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কমিউনিটি পুলিশিংকে পুলিশের একটি বিশেষ শাখা হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার আওতায় আনার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, ৫ আগস্টের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কী অবস্থায় ছিল, তা সবার জানা। সে সময় পুলিশ নিষ্ক্রিয় ছিল এবং বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলেছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বর্তমানে দেশের সব জায়গায় পুলিশের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি করেন আইজিপি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। বেকারত্বসহ বিভিন্ন সমস্যার রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়, তবে সার্বিক অবস্থার দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে।
আইজিপির বক্তব্যে পুলিশের সামনে থাকা একটি মৌলিক প্রশ্ন স্পষ্ট হয়েছে কেবল অভিযান ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে কি অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব, নাকি সাধারণ মানুষকে নির্ভয়ে অভিযোগ জানানোর পরিবেশও তৈরি করতে হবে?
চাঁদাবাজির শিকার ব্যক্তি ভয় পেলে পুলিশের নিজস্ব উদ্যোগে মামলা করার পরিকল্পনা অপরাধ দমনে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই, নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষীর নিরাপত্তা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগও গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে জনবান্ধব পুলিশিং প্রতিষ্ঠার অর্থ অপরাধের ক্ষেত্রে শিথিলতা নয়; বরং আইন মেনে, বৈষম্যহীনভাবে এবং জবাবদিহির সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা।