প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ৬, ২০২৬, ৮:২০ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ৬, ২০২৬, ৭:৪২ অপরাহ্ণ

প্রমথ সানা, পাইকগাছা থেকে: সরকারি হাসপাতালে কোটি টাকার এক্স-রে মেশিন ধুলোবালি মেখে জং ধরে পড়ে রয়েছে, অথচ হাড় ভাঙা বা ফুসফুসের তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে আসা দরিদ্র রোগীদের শেষ সম্বলটুকু সম্বল করে ছুটতে হচ্ছে বাইরের প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।
সরকারি স্বাস্থ্যসেবার দোরগোড়ায় এসেও তারা ফিরছেন খালি হাতে, কারণ হাসপাতালের এক্স-রে কক্ষের দরজায় ঝুলছে দীর্ঘদিনের তালা। খুলনার পাইকগাছা ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে সেবা অদ্যাবধি চালু না হওয়ায় চরম ভোগান্তি ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে সাধারণ রোগীদের মধ্যে।
উল্লেখ্য, তৎকালীন থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি উদ্বোধন করা হয়েছিল ২২শে অক্টোবর ১৯৯৭ ইং তারিখে। দীর্ঘ ২৯ বছর পার হয়ে গেলেও আজও এই প্রান্তিক জনপদের মানুষের সরকারি মূলধারার এক্স-রে সেবার আকাঙ্ক্ষা অধরাই থেকে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উপকূলীয় এ অঞ্চলের লাখো মানুষের স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসাস্থল এই হাসপাতালটি। রোগীদের সুবিধার্থে একাধিকবার সরকারি বরাদ্দে কোটি টাকা মূল্যের আধুনিক এক্স-রে মেশিন হাসপাতালে আনা হলেও তা কোনোদিন আলোর মুখ দেখেনি। টেকনিশিয়ান ও জনবল সংকটে জং, মরিচা ধরে যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে স্তুপাকারে পড়ে রয়েছে। বলা যায় বছরের পর বছর এক্স-রে বিভাগটি তালা মেরে রাখা হয়েছে।
সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে বাধ্য হয়ে রোগীদের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে হাসপাতালের চারপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে। যেখানে সরকারিভাবে নামমাত্র খরচে এক্স-রে করার কথা, সেখানে বাইরের ক্লিনিকগুলোতে প্রতি রিপোর্টের জন্য গুণতে হচ্ছে ৪শত থেকে ৮শত টাকা, ক্ষেত্রবিশেষে তার চেয়েও বেশি। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন দিনমজুর, প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের খেটে খাওয়া মানুষ, যাদের পক্ষে এই বিপুল অর্থ বহন করা প্রায় অসম্ভব।
চিকিৎসা নিতে আসা এক অসহায় রোগীর স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "হাসপাতালে ডাক্তার দেখানোর পর এক্স-রে করতে বললে বাইরের ক্লিনিকে যেতে হয়। সেখানে একেকটি রিপোর্টের জন্য ৮০০ টাকা পর্যন্ত কেটে নিচ্ছে। আমরা গরিব মানুষ, এত টাকা কোথা থেকে দেব?" অভিযোগ উঠেছে, তৎকালীন হাসপাতালের চিকিৎসকদের একাংশের সঙ্গে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর অশুভ 'কমিশন বাণিজ্য' ও যোগসাজশের কারণেই এক্স-রে মেশিনটি সচল করতে কর্তৃপক্ষের কোনো আন্তরিক সদিচ্ছা দেখা যায় নি।
সচেতন মহলের মতে, দীর্ঘ ২৯ বছর ধরে চলমান এই সংকটে স্থায়ী জনবল সংকট, টেকনিশিয়ান, আধুনিক এক্স-রে মেশিন, নির্দিষ্ট কক্ষ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
আধুনিক মেশিন থাকলে স্থানীয়ভাবে কিংবা ফ্রি সার্ভিস/আউটসোর্সিং লোক নিয়োগের মাধ্যমে অন্তত জরুরি সময়ের জন্য হলেও এক্স-রে সার্ভিসটি চালু রাখা সম্ভব।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসানারা আহমেদ বলেন, আমাদের আধুনিক এক্স-রে মেশিন, টেকনিশিয়ান ও মেশিন রাখার কক্ষ নাই। একটা মেশিন রয়েছে সেটা দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় মরিচা ধরে যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে। আমি দায়িত্ব পাওয়ার পর বিষয়গুলো ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। দ্রুত সমাধান করে এটি চালু করার জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।"
সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো কি তবে শুধু নামেই দাঁড়িয়ে থাকবে? উপকূলীয় এই প্রান্তিক জনপদের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং দালালি ও কমিশন বাণিজ্য বন্ধে অনতিবিলম্বে এক্স-রে বিভাগটি চালুর জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী। তারা এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।