
মো.কামাল উদ্দিন: ঢাকা আমাকে বারবার ডাকে। চট্টগ্রামের পাহাড়, সাগর আর পরিচিত মানুষের ভিড়ের মাঝেও কখনো কখনো রাজধানীর ব্যস্ততা, মানুষের সান্নিধ্য এবং কিছু স্মরণীয় সাক্ষাৎ যেন অদৃশ্য এক টানে আমাকে কাছে টেনে নেয়। ঠিক তেমনই এক সন্ধ্যায়, ধানমন্ডি ২৫-এর একটি কফি শপে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল বাংলাদেশের সাংবাদিকতার অন্যতম সাহসী মুখ, বিশিষ্ট সাংবাদিক আনিস আলমগীরের সঙ্গে।
এটি ছিল না কেবল একটি সাক্ষাৎ। এটি ছিল সময়ের সঙ্গে, স্মৃতির সঙ্গে এবং সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সঙ্গে পুনর্মিলন।
কফি শপের উজ্জ্বল আলোয় তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন স্বভাবসুলভ শান্ত, সংযত এবং আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে। তার মুখে ছিল দীর্ঘ পথচলার অভিজ্ঞতার ছাপ, আর চোখে ছিল এক অদম্য দৃঢ়তা। পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, আমি যেন একজন মানুষকে নয়, বাংলাদেশের সাংবাদিকতার একটি জীবন্ত ইতিহাসকে স্পর্শ করছি।
নিজের পরিচয় দেওয়ার পর তিনি যে আন্তরিকতা দেখালেন, তা আমাকে সত্যিই অভিভূত করেছে। আরও বিস্মিত হয়েছি যখন তিনি স্মরণ করলেন সেই সময়ের কথা, যখন তিনি বন্দি ছিলেন এবং আমি তার মুক্তির দাবিতে লিখেছিলাম। একজন সাংবাদিক, লেখক ও নাগরিক হিসেবে আমি তখন বিশ্বাস করেছিলাম—একজন মানুষের স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়, এটি ছিল সাংবাদিকতার স্বাধীনতার প্রশ্ন। আজ এতদিন পরও তিনি সেই লেখার কথা মনে রেখেছেন। এই স্মরণশক্তি নয়, এই কৃতজ্ঞতাবোধই একজন বড় মানুষের পরিচয়।
আনিস আলমগীর বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এমন একটি নাম, যার কর্মজীবন সাহস, সততা এবং পেশাদারিত্বের এক অনন্য দলিল। প্রিন্ট মিডিয়ায় যাত্রা শুরু করে তিনি ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় নিজের মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। সংবাদকে কখনো তিনি ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে দেখেননি; বরং দেখেছেন মানুষের জানার অধিকার রক্ষার একটি দায়িত্ব হিসেবে।
যুদ্ধক্ষেত্রের সাংবাদিক হিসেবে তার অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। ইরাক-কুয়েত যুদ্ধের ভয়াবহ রণাঙ্গন থেকে জীবন বাজি রেখে সংবাদ পাঠিয়েছেন তিনি। যখন চারপাশে বিস্ফোরণের শব্দ, মৃত্যুর আতঙ্ক এবং ধ্বংসস্তূপের স্তূপ, তখনও তিনি সত্যের সন্ধানে ছিলেন অবিচল। সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা তার লেখায় যেমন জীবন্ত হয়ে উঠেছে, তেমনি নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য হয়ে আছে সাহসের এক অনন্য পাঠশালা।
একুশে টেলিভিশনের বার্তা প্রধান হিসেবে এবং পরবর্তীতে ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে তিনি সংবাদ পরিবেশনে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছেন। তার নেতৃত্বে সংবাদ কেবল দ্রুত নয়, দায়িত্বশীলও হয়েছে। তথ্য যাচাই, সম্পাদকীয় সততা এবং জনস্বার্থ—এই তিনটি বিষয়কে তিনি সবসময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন।
কিন্তু সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার মূল্যও তাকে দিতে হয়েছে। নানা প্রতিকূলতা, অপপ্রচার, এমনকি কারাবন্দিত্বের মতো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। অথচ ইতিহাস সাক্ষী, সত্যকে কখনো দীর্ঘদিন বন্দি রাখা যায় না। মানুষকে সাময়িকভাবে কারাগারে আটকে রাখা যায়, কিন্তু তার চিন্তা, বিবেক এবং আদর্শকে বন্দি করা যায় না।
আজ ধানমন্ডির সেই কফি শপে বসে আলাপের একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল, আমরা যেন শুধু দুজন মানুষ কথা বলছি না; কথা বলছে দুটি সময়। একটি সময়, যখন সাংবাদিকতা ছিল সত্য অনুসন্ধানের পবিত্র দায়িত্ব; আরেকটি সময়, যখন সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়।
ছবির দিকে তাকালে হয়তো অনেকেই কেবল দুজন মানুষকে দেখবেন। কিন্তু আমি দেখি আরও অনেক কিছু। আমি দেখি একজন সাহসী সংবাদযোদ্ধাকে, যিনি ঝড়ের মধ্যেও কলম থামাননি। আমি দেখি একজন মানুষকে, যিনি বিশ্বাস করেন সত্য শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হবেই। আর আমি দেখি সেই অদৃশ্য বন্ধন, যা সৃষ্টি হয় ন্যায়, সততা এবং পেশাগত শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে।
বিদায়ের সময় মনে হচ্ছিল, আনিস আলমগীর কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি প্রতীক। তিনি সেইসব সাংবাদিকদের প্রতিনিধি, যারা সুবিধার কাছে মাথা নত করেন না, ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ করেন না এবং সত্যের প্রশ্নে আপস করেন না।
আজ আবারও তাকে নিয়ে লিখতে বসলাম। কারণ কিছু মানুষকে নিয়ে বারবার লিখতে হয়। কিছু মানুষের কথা ইতিহাসের কাছে বারবার বলতে হয়। কিছু মানুষের সংগ্রাম নতুন প্রজন্মকে জানাতে হয়।
আনিস আলমগীর তাদেরই একজন। কারণ সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষদের নামই একদিন ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে থাকে। আর যারা সত্যকে বন্দি করতে চায়, তারা হারিয়ে যায় সময়ের অন্ধকারে।
সালাম,
আনিস আলমগীর।
সালাম, সত্যের পক্ষে অবিচল থাকা এক সাহসী কলম যোদ্ধাকে।