কথা বলতে বলতে একসময় কথা ফুরিয়ে যায়। প্রশ্ন করতে করতে একসময় প্রশ্নও অর্থহীন মনে হয়। লিখতে লিখতে মনে হয়—কে পড়বে? প্রতিবাদ করতে করতে মনে হয়—কী পরিবর্তন হবে?
তারপরও প্রশ্ন জাগে—দেশটা কি এভাবেই চলবে?
কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাবেন কি না, শ্রমজীবী মানুষ তার ঘামঝরা শ্রমের সম্মান পাবেন কি না, বিদ্যুৎ থাকবে কি না, রাস্তায় মানুষ নিরাপদ কি না, প্রশাসনের কাছে সাধারণ মানুষের কথা শোনা হবে কি না, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা স্বস্তিদায়ক—এসব প্রশ্ন কি করা যাবে না?
অবশ্যই যাবে। বরং একটি রাষ্ট্রের সুস্থতার অন্যতম লক্ষণ হলো—তার নাগরিকেরা প্রশ্ন করতে পারেন এবং প্রতিষ্ঠানগুলো সেই প্রশ্নের জবাব দিতে প্রস্তুত থাকে।
কিন্তু আমাদের চারপাশে যে বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, তাতে অনেক সময় মনে হয়, প্রশ্ন করার চেয়ে চুপ থাকা যেন নিরাপদ; সত্য বলার চেয়ে নিজেকে আড়াল করাই যেন বুদ্ধিমানের কাজ।
তাহলে কি আমরা সবাই নন্দলাল হয়ে যাচ্ছি?
মৃত্যুর খবরের আড়ালে যে প্রশ্নগুলো
সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সামনে সেই পুরোনো প্রশ্নটিই নতুন করে হাজির করছে—মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কোথায়?
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়া এবং পরে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা একটি পরিবারকে যে অসহনীয় শোকের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে, তা কেবল একটি পরিবারের ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একইভাবে খুলনায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজমল হোসেনকে চাল চুরির অভিযোগে মারধর ও ভবন থেকে ফেলে দেওয়ার অভিযোগও সমাজের বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
মানিকগঞ্জের কৃষ্ণনগর ইউনিয়নে প্রিয়াঙ্কা আক্তার ও তাঁর দেড় বছরের শিশুকন্যা আলিজার মৃত্যু এবং স্বামী আকরাম হোসেনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এসব ঘটনায় তদন্ত চলছে বা পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য এসেছে—চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণ করবে তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্নটি খুব সরল—
একটি প্রাণ হারানোর পরই কেন এত প্রশ্নের জন্ম হয়? প্রশ্নগুলো কি আগে করা যেত না?
আরও বড় প্রশ্ন—আমরা কি প্রতিটি ঘটনার পর কয়েকদিন আলোচনা করে আবার ভুলে যাব?
নাকি প্রতিটি ঘটনার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করব?
পুলিশের বক্তব্যই কি শেষ কথা?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের বক্তব্য, তদন্ত ও আইনগত পদক্ষেপের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কোনো ঘটনার চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে দিলে প্রশ্ন থেকেই যায়।
কারণ তদন্তের উদ্দেশ্য শুধু একটি ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়া নয়; সত্য উদঘাটন করা।
অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধী কে, কীভাবে অপরাধ ঘটল, কেন ঘটল, কারও গাফিলতি ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করাই তদন্তের কাজ।
পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য তদন্তের শুরু হতে পারে, শেষ সত্য নয়।
তাই কোনো ঘটনার পর দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তথ্য প্রকাশ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বও কম নয়। যাচাই ছাড়া উত্তেজনা সৃষ্টি করা যেমন সাংবাদিকতা নয়, তেমনি প্রশ্নহীনভাবে কোনো সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য গ্রহণ করাও সাংবাদিকতার কাজ নয়।
সত্যের কাছে দায়বদ্ধ থাকাই সাংবাদিকতার মূল শক্তি।
আমরা কি শুধু নিজের প্রাণ বাঁচাব?
বিপদ দেখলে দূরে সরে যাওয়া মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু একটি সমাজ যখন প্রত্যেকে শুধু নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবে, তখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো কেউ অবশিষ্ট থাকে না।
আজ যদি অন্যের বাড়িতে অন্যায় হয়, আমরা বলি—“আমার কী?”
কাল যদি পাশের বাড়ির মানুষ নির্যাতিত হন, আমরা বলি—“ঝামেলায় যাব কেন?”
পরদিন কোনো শিক্ষার্থী অন্যায়ের শিকার হলে বলি—“ওর ব্যাপার, ওরা দেখুক।”
একসময় সেই অন্যায় যখন নিজের দরজায় এসে দাঁড়ায়, তখন পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকে আর পাওয়া যায় না।
এটাই নীরবতার সবচেয়ে ভয়ংকর পরিণতি।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘নন্দলাল’ তাই শুধু একটি কবিতার চরিত্র নয়; আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্বেরও এক চিরন্তন প্রতীক। বিপদ এড়িয়ে নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে চলা, সবকিছু দেখেও না দেখার ভান করা, অন্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দায় অস্বীকার করা—এই মানসিকতা হয়তো ব্যক্তিকে সাময়িক স্বস্তি দেয়, কিন্তু সমাজকে নিরাপদ করে না।
প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে গেলে
এই ভূখণ্ডের ইতিহাস বলে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা কখনোই সহজ ছিল না।
কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহের ভাষা দিয়েছেন। সুকান্ত ভট্টাচার্য ক্ষুধার্ত মানুষের কথা বলেছেন। হেলাল হাফিজ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, সুফিয়া কামাল, কাজী রোজী, মল্লিকা সেনগুপ্তসহ অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক তাঁদের নিজ নিজ সময়ে সমাজের অন্ধকারকে প্রশ্ন করেছেন।
তাঁদের ভাষা এক ছিল না, মতাদর্শ এক ছিল না, সময়ও এক ছিল না। কিন্তু তাঁদের সৃষ্টির একটি জায়গায় মিল ছিল—নীরবতাকে তাঁরা চূড়ান্ত সত্য হিসেবে মেনে নেননি।
আজ আমাদেরও সেই প্রশ্ন করার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে।
প্রশ্ন করতে হবে কৃষকের দুর্দশা নিয়ে।
প্রশ্ন করতে হবে দ্রব্যমূল্য নিয়ে।
প্রশ্ন করতে হবে বিদ্যুৎ ও জনসেবা নিয়ে।
প্রশ্ন করতে হবে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে।
প্রশ্ন করতে হবে প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে।
প্রশ্ন করতে হবে নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে।
তবে প্রশ্ন মানেই বিদ্বেষ নয়। সমালোচনা মানেই বিরোধিতা নয়। আবার সমর্থন মানেই সবকিছু মেনে নেওয়াও নয়।
গণতান্ত্রিক সমাজে প্রশ্নই জবাবদিহির প্রথম দরজা।
নন্দলাল হয়ে নয়, নাগরিক হয়ে দাঁড়ানোর সময়
আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রাজনৈতিক স্লোগান নয়, নাগরিক সাহস।
আমাদের অন্ধ বিরোধিতা দরকার নেই। অন্ধ সমর্থনও দরকার নেই। দরকার সত্য জানার অধিকার, প্রশ্ন করার অধিকার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার নৈতিক শক্তি।
একজন কৃষকের কথা বললে কৃষকের বিরুদ্ধে যাওয়া হয় না। একজন শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন করলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যাওয়া হয় না। প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলে প্রশাসনবিরোধী হওয়া যায় না।
বরং জবাবদিহি দাবি করাই একটি দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজের পরিচয়।
আর সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ মানুষ যখন ভয় পায়, তখন সংবাদমাধ্যমের কলমই অনেক সময় তার হয়ে কথা বলে। তাই সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় দায় কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি নয়—সত্য ও মানুষের প্রতি।
আমাদের মনে রাখতে হবে, নীরবতা সবসময় নিরপেক্ষতা নয়। অনেক সময় নীরবতা অন্যায়ের জন্য জায়গা তৈরি করে।
তাই আজ প্রশ্নটা শুধু—দেশটা কোথায় যাচ্ছে—তা নয়।
প্রশ্ন হলো—
আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?
আমরা কি কেবল দর্শক হয়ে থাকব?
আমরা কি শুধু নিজের নিরাপত্তাটুকু নিশ্চিত করেই দায়িত্ব শেষ করব?
নাকি নাগরিক হিসেবে সত্যের পক্ষে দাঁড়াব?
সময় এসেছে নন্দলাল হওয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার।
নন্দলাল হয়ে নয়—সচেতন নাগরিক হয়ে দাঁড়াতে হবে।
ভয়ের কাছে নয়—সত্যের কাছে দায়বদ্ধ হতে হবে।
নীরবতার নিরাপত্তা নয়—ন্যায়ের পক্ষে কথা বলার সাহস বেছে নিতে হবে।
দেশটা রসাতলে যাক—এ কথা বলা সহজ।
কিন্তু দেশটাকে রসাতল থেকে ফেরানোর দায় নিজের কাঁধে নেওয়াই প্রকৃত নাগরিকত্ব।
আজ আমরা যদি চুপ থাকি, কাল ইতিহাস আমাদের জিজ্ঞাসা করবে—
অন্যায় যখন সামনে ঘটছিল, তখন তোমরা কোথায় ছিলে?
সেদিন যেন আমাদের উত্তর না হয়—
“আমরা নন্দলাল ছিলাম।”
বরং ইতিহাস যেন লিখতে পারে—
অন্যায়ের সময়ে তারা নীরব থাকেনি।
ভয়ের সময়ে তারা প্রশ্ন করেছে।
অন্ধকারের সময়ে তারা সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল।
এই দেশ কারও একার নয়—এ দেশ আমাদের সবার।
তাই দেশকে রসাতলের দিকে যেতে দেখে নন্দলাল হয়ে বসে থাকা নয়;
দেশকে রক্ষা করার জন্য নাগরিক হিসেবে দাঁড়ানোই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
কল্যাণ ব্যানার্জি
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সমাজকর্মী