
মোঃ ইশারাত আলী,:দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের জন্য বরাদ্দ খাবার সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ এখন আর কেবল অভিযোগের পর্যায়ে নেই। স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত অভিযোগের পর হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী অনিয়মের সত্যতা পাওয়ার পর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই পদক্ষেপের পরও সামনে এসেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন, যার উত্তর মিলতে পারে ঠিকাদারি কার্যাদেশ, টেন্ডার নথি, খাদ্য সরবরাহের বিল-ভাউচার এবং খাদ্য গ্রহণের রেজিস্টার পর্যালোচনা করলেই।
১২ আগস্ট বুধবার হাসপাতাল পরিদর্শনে যান সাতক্ষীরা-২ আসনের এমপি মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক। ওই সময় রোগীদের নির্ধারিত খাবার সরবরাহ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কম্পিউটার অপারেটর রাজিব কুমার রায়ের দাবি, সেদিন নিয়ম অনুযায়ী খাসির মাংস দেওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদার কামরুল ইসলাম ব্রয়লারের মাংস সরবরাহ করেন। বিষয়টি তিনি এমপিকে জানান বলেও দাবি করেন।
রাজিব কুমার রায় বলেন, তিনি মাত্র এক মাস আগে অফিস আদেশের মাধ্যমে খাদ্য বিভাগের দায়িত্ব পেয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ঠিকাদারকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না তাঁর কাছে বাজারের খাদ্য বুঝিয়ে দেওয়া হলে তিনি তা গ্রহণ করেন। নিজের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের সম্পৃক্ততার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। তবে তিনি দাবি করেন, হাসপাতালের খাদ্য ব্যবস্থাপনায় এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো নিয়ে কথা বলা কঠিন। তাঁর বক্তব্যে একটি সম্ভাব্য প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা ‘সিন্ডিকেট’-এর অভিযোগও উঠে এসেছে। এই দাবি তদন্তের দাবী রাখে।
ঘটনার পর ১৬ আগস্ট সরেজমিনে হাসপাতাল পরিদর্শন করেন সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. মো. আব্দুস সালাম। তিনি অনিয়মের সত্যতা পাওয়ার কথা জানান। তাঁর পরিদর্শনের পর খাদ্য সরবরাহকারী হিসেবে উল্লেখ করা কামরুল ইসলামের বিল বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে খাদ্য বুঝে নেওয়ার দায়িত্বে থাকা রাজিব কুমার রায়ের বেতন বন্ধের মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
তবে এখানেই অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-যদি নির্ধারিত খাবারের পরিবর্তে অন্য খাবার সরবরাহ হয়ে থাকে, তাহলে সেই খাবার কে অনুমোদন করলেন, কে গ্রহণ করলেন এবং বিল পরিশোধের প্রক্রিয়ায় কারা যুক্ত ছিলেন? কারণ শুধু সরবরাহের অনিয়ম চিহ্নিত করলেই পুরো ব্যবস্থার দায় নির্ধারণ হয় না। সরবরাহের আগে চাহিদাপত্র, কার্যাদেশ, নির্ধারিত মেনু এবং বাজারদর অনুযায়ী ক্রয় ও সরবরাহের নথিও যাচাই করা প্রয়োজন।
অনুসন্ধানে হাসপাতালের খাদ্য সরবরাহকারী ঠিকাদারের পরিচয় নিয়েও বক্তব্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। প্রধান হিসাব সহকারী আয়ূব হোসেন জানান, তিনি দেবহাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায় এক বছর ধরে কর্মরত। তাঁকে খাদ্য সরবরাহকারী ঠিকাদারের নাম জানতে চাইলে তিনি আব্দুস সাত্তারের নাম উল্লেখ করেন। কামরুল ইসলাম নামে কাউকে চেনেন কি না জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি অফিসে কথা বলতে বলেন।
অন্যদিকে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে কামরুল ইসলামকেই খাদ্য সরবরাহকারী ঠিকাদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে একই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যে ঠিকাদারের পরিচয় নিয়ে পার্থক্য কেন, তা পরিষ্কার হওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে কার্যাদেশ ও সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিই হবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ।
এদিকে তালা ও সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের খাদ্য সরবরাহকারী ঠিকাদার নজরুল ইসলাম বলেন, তিনি দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ঠিকাদার নন। তবে অনুসন্ধানে পাওয়া একটি সূত্রের দাবি, তাঁর বড় ছেলে কামরুল ইসলাম দেবহাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের খাদ্য সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত। কামরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। নজরুল ইসলামও দেবহাটার খাদ্য সরবরাহ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন আমি সাতক্ষীরা মেডিকেল ও তালা হাসপাতালের ঠিকাদার। এদুটি হাসপাতাল সম্পর্কে জানতে চাইলে বলতে পারবো।ফলে এখানে তিনটি বিষয় নথির মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন-কার নামে কার্যাদেশ, কার নামে বিল, আর বাস্তবে কে খাদ্য সরবরাহ করছেন। এই তিনটি তথ্যের মধ্যে কোনো অমিল থাকলে তা সরকারি ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার আরেকটি বড় প্রশ্ন দীর্ঘদিনের ঠিকাদারি জটিলতা। সিভিল সার্জন ডাঃ মো. আব্দুস সালাম জানান, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে মামলা চলছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৪ বছর ধরে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের রায় স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষে যাওয়ার পর নতুন করে টেন্ডারের উদ্যোগ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ উচ্চ আদালতে আপিল করে তা বন্ধ করে দেয়। এই তথ্য সত্য হলে দীর্ঘ সময় ধরে একটি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের রোগীদের খাদ্য সরবরাহ কীভাবে পরিচালিত হয়েছে, কোন প্রক্রিয়ায় সরবরাহকারী নির্ধারিত হয়েছে এবং সরকারি অর্থের বিল কীভাবে অনুমোদিত হয়েছে, সেটিও অনুসন্ধানের আওতায় আসা প্রয়োজন। আদালতে মামলা চলমান বা আপিলাধীন থাকলে সংশ্লিষ্ট নথি ও আদালতের আদেশ পর্যালোচনা করেই বিষয়টির পূর্ণ চিত্র নিশ্চিত করা যেতে পারে।
দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, রোগীদের খাদ্যের গুণগত মান বজায় রাখা ও নিয়ম মেনে খাবার দেওয়ার বিষয়ে অভিযোগের পর এমপি ও সিভিল সার্জনের পরিদর্শনে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া যায়। এরপর খাদ্য সরবরাহকারী ঠিকাদার কামরুল ইসলামের বিল বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং খাদ্য বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব পাওয়া রাজিব কুমার রায়ের বেতন বন্ধের মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়।
কিন্তু একজন ঠিকাদারের বিল বন্ধ এবং একজন কর্মচারীর বেতন বন্ধ করলেই কি সমস্যার মূল কারণ বেরিয়ে আসবে? যদি নির্ধারিত মেনু অনুযায়ী খাবার সরবরাহ না হয়ে থাকে, তাহলে চাহিদা তৈরি থেকে শুরু করে খাদ্য গ্রহণ, মান যাচাই, রেজিস্টারে স্বাক্ষর এবং বিল অনুমোদন পর্যন্ত পুরো চেইন পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যিনি যে দায়িত্বে ছিলেন, তাঁর লিখিত দায়িত্বপত্রও যাচাই করা দরকার। দেবহাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের খাদ্য সরবরাহের অনিয়মের প্রকৃত চিত্র বের করতে অন্তত কয়েকটি নথি পর্যালোচনা করা জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে সংশ্লিষ্ট সময়ের টেন্ডার নথি, কার্যাদেশ, অনুমোদিত মেনু, সরবরাহের চালান, খাদ্য গ্রহণের রেজিস্টার, বিল-ভাউচার, দায়িত্ব বণ্টনের অফিস আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশ। এসব নথি মিলিয়ে দেখা গেলে নির্ধারিত খাবারের পরিবর্তে অন্য খাবার সরবরাহের অভিযোগটি কীভাবে ঘটেছে এবং কোথায় দায়িত্বের ব্যত্যয় হয়েছে, তা স্পষ্ট হতে পারে।
রোগীদের জন্য বরাদ্দ খাবার কোনো ব্যক্তির অনুকম্পা নয়, এটি সরকারি ব্যবস্থার অংশ। তাই অনিয়মের অভিযোগ উঠলে শুধু সাময়িক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়, প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ নথিভিত্তিক তদন্ত। বিশেষ করে ঠিকাদার নির্বাচন, সরবরাহের বাস্তবতা, খাদ্য গ্রহণের প্রক্রিয়া ও সরকারি বিল পরিশোধের প্রতিটি ধাপ যাচাই করা দরকার।
দেবহাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাম্প্রতিক ঘটনার পর প্রশাসনিক পদক্ষেপ শুরু হয়েছে। এখন মূল প্রশ্ন, এই পদক্ষেপ কি কেবল বিল ও বেতন বন্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার পুরো চিত্র? রোগীর পাতে নির্ধারিত খাবার পৌঁছানো নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ঠিকাদারি জটিলতা ও দায়িত্ব ব্যবস্থাপনার অসঙ্গতিও নিরসন করা এখন স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য বড় পরীক্ষা।