তালা অফিস থেকে নজরুল ইসলাম: তালা উপজেলা প্রশাসন অদম্য নারী পুরষ্কার-২০২৫ এর জন্য ৫টি ক্যাটাগরীতে ৫ নারীর প্রত্যেকের জীবনে রয়েছে অসীম আত্মশক্তি ও সংগ্রামের আলাদা আলাদা জীবন কাহিনী।
অদম্য এই পাঁচ নারীর জীবন যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত কাহিনী তুলে ধরা হলো : নির্যাতিতা থেকে উদ্যোমী, কর্মঠ ও স্বাবলম্বী নারী ফরিদা বেগম তালা ইউনিয়নের বারুইহাটি গ্রামের মোঃ ওয়াজেদ মোড়লের কন্যা। ৪ ভাই-বোনের মধ্যে ফরিদা বেগম সবার বড়। বাবার বাড়ির আর্থিক অবস্থা মোটামোটি ভাল ছিল। ৭ম শ্রেণিতে পড়ার সময় মাত্র ১৪ বছর বয়সে তার বিয়ে হয় তালা সদর ইউনিয়নের শিবপুর গ্রামের আশরাফ হোসেন খাঁ’র সাথে। স্বামী বেকার থাকায় শশুর বাড়ির লোক তাকে ভাল চোখে দেখাতো না। বিয়ের ২ বছর পরে তার পর পর দুটি মৃত সন্তান হয়। এক পর্যায়ে তার স্বামী মাছের ব্যবসা শুরু করে। কিছুদিন পর একটি মামলায় জেলে যায় তার স্বামী, তখন এক বছর বছর বয়সী একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহন করেন। সংসার চালাতে এক পর্যায়ে দর্জির প্রশিক্ষণ নেন ফরিদা। তখন প্রশিক্ষণ থেকে পাওয়া ১ হাজার ৫শত টাকা এবং পিতার কাছ থেকে দেড় হাজার টাকা নিয়ে একটি সেলাই মেশিন ক্রয় করেন তিনি। এদিকে স্বামী জেল থেকে বের হয়ে আরেকটা বিয়ে করে। সেখানে ঝামেলা বাধিয়ে আবারও জেলে যান তিনি। তাদের একমাত্র মেয়ে এইচএসসি পাস করার পরে ননদের ছেলের সাথে তাকে বিয়ে দেয়া হয়। মেয়েকে তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন পড়াশুনা বন্ধ করে দেয়। তখন ফরিদা তার মেয়ে-জামাইকে নিজ বাড়িতে রেখে পড়াশুনা করাতে থাকে। জামাই অর্নাস পাশ করে একটা কোম্পানীতে চাকরী পায়। তখন জামাই শ্বাশুড়ির কাছে একটা মটরসাইকেল দাবী করে। মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে শ্বশুর বাড়ির জমি বিক্রি করে তাকে মটরসাইকেল কিনে দেয়া হয়। তার পরেও চলতে থাকে মেয়ের উপর নির্যাতন। এক পর্যায়ে মেয়ের ডির্ভোস হয়ে যায়। পরে মেয়েকে নার্সিংয়ে ভর্তি করানো হয়। মেয়ের নার্সিং পড়া শেষ হলে চাকুরী পায় ঢাকায় স্কায়ার হাসপাতালে। চাকুরী পাবার পরে আবারও তাকে বিয়ে দেয়া হয়। নতুন সংসারে ভালো আছে তারা। আর ফরিদা বেগম নিজে দর্জি কাজ করেন। বর্তমানে সুখে শান্তিতে চলছে তাদের সংসার।
শিক্ষা ও চাকুরীক্ষেত্রে সফল নারী রুপা রানী পাল তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা থানার পারকুমিরা গ্রামের কোমল চন্দ্র পালের কন্যা। তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবা ছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বাবার আর্থিক অবস্থা ছিল খুবই দুর্বল। তিনবোনের পড়ালেখা আর সংসার সামলাতে গিয়ে তার বাবাকে প্রায়ই হিমশিম খেতে হতো। রুপা রানী পাল বর্তমানে তালার পাটকেলঘাটা আদর্শ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (বিজ্ঞান) হিসেবে চাকুরীরত আছেন। স্কুল থেকে শুরু করে ইউনির্ভাসিটি পর্যন্ত ভালো একটা জামা ছিল না, ভালো একটা পরার মতো জুতা ছিল না। মা ছিলেন তার গৃহ শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক। বিশ্ববিদ্যলয়ে স্টুডেন্ট থাকাকালীন সময়ে তিনি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবামূলক সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত হন। মাস্টার্স পাশ করার পরে শিক্ষকতা পেশায় চাকুরী পান তিনি।
সফল জননী সুচিত্রা দাশ তালা উপজেলার টিকারামপুর গ্রামের দুলাল চন্দ্র দাসের কন্যা। পিতা-মাতার ৭ সন্তানের মধ্যে তিনি ৪র্থ কন্যা। অসচ্ছল সংসারে অভাব অনটনের ফলে মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও ৮ম শ্রেণির বেশি পড়াশুনা করতে পারেনি সুচিত্রা দাশ। অল্প বয়সেই তার বিয়ে হয়ে যায় এক হতদরিদ্র পরিবারে। সংসারে দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে না পেরে এক কাপড়ে স্বামীর হাত ধরে যশোরের মনিরামপুর ত্যাগ করে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার খলিষখালী ইউনিয়নের টিকারামপুর গ্রামে চলে আসেন। সেখানে পরের জমিতে মজুরী খেটে সংসার চালান। স্বামী গ্রাম্য ডাক্তারের প্রাকটিস শুরু করেন। ইতোমধ্যে তাদের দু’টি সন্তান হয়। তার অদম্য ইচ্ছা ছিল সন্তানদের মানুষের মত মানুষ করা। অন্যের কাছে ধার দেনা করে সন্তানদের লেখাপড়া করান। অবশেষে তাদের অধরা স্বপ্ন ধরা দেয়। তার একমাত্র ছেলে শুভংকর দাস, ৪৮ তম বিসিএস স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের মেডিকেল অফিসার হিসাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তার একমাত্র কন্যা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য স্নাতকোত্তর শেষ করেছে। তার দুই সন্তান মানবের সেবায় নিজেদের উজাড় করে দিবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন সফল জননী সুচিত্রা দাশ।
অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী রাবিয়া বিবি তালা উপজেলার সরুলিয়া ইউনিয়নের পারকুমিরা গ্রামের নাসের উদ্দীন বিশ্বাসের কন্যা। এক সময়ে কিছুই ছিলনা রাবিয়া বিবির। এক সময়ে অর্ধাহারে থাকা রাবিয়া বিবি বর্তমানে ছেলে-মেয়ে নিয়ে সুখে শান্তিতে জীবন যাপন করছেন। একাধিক কর্মসংস্থানের মধ্য দিয়ে দারিদ্রতার মধ্য থেকেও তিনি দু’টি সন্তানকে শিক্ষিত করেছেন। বর্তমানে তার বড় কন্যা আম্বিয়া খাতুন অর্নাস পাস করে ব্র্যাক এনজিওতে চাকুরীরত রয়েছেন। ছেলে অনার্স পাস করে নিজ বাড়িতে বিশুদ্ধ পানি রিপাইনিং মেশিন বসিয়ে ব্যবসা করছেন। তাদের সংসারে আর কোন অভাব নেই।
সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন তালা থানার মাছিয়াড়া গ্রামের ওয়াজেদ আলী গাজীর কন্যা সংরক্ষিত ইউপি সদস্য শিরিনা সুলতানা। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে শিরিনা সবার বড়। দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান শিরিনা ছোটবেলা থেকেই সংগ্রামী ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে এসেছেন। সংসারে দারিদ্রতার সাথে লড়াই করে এইচএসসি পাশ করে সমাজ উন্নয়নে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন তিনি। ২০০৩ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে প্রথমবারের মতো তালা উপজেলার ১২নং খলিলনগর ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন। টানা তৃতীয় বারের মত নারী সংরক্ষিত ওয়ার্ডে নির্বাচিত হয়ে সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে জনগণের আস্থা অর্জন করেছেন। শিরিনা সুলতানা হয়ে উঠেছেন একজন অদম্য নারী, যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন সমাজ উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়নের জন্য। বাকি জীবনও সমাজ উন্নয়নে কাজ করে যাবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।