প্রিন্ট এর তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬, ৯:৩৫ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬, ৭:৩৭ অপরাহ্ণ

সরকার ফের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ছে। ডিজেল, আকটেন, পেট্রল এবং কেরোসিনের দাম প্রতি লিটার ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। নতুন দাম অনুযায়ী এখন প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬০ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকায় বিক্রি হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে গত রোববার রাতে জারিকরা প্রজ্ঞাপনে জ্বালানির নতুন দাম নির্ধারণ করা হয় এবং রাত ১২টার পর থেকেই তা কার্যকর করা হয়। স্মরণ করা যেতে পারে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত সাত মাসে এই নিয়ে তিন দফা জ্বালানির দাম বাড়ানো হলো।
প্রথম বাড়ানো হয়, গত ১৮ এপ্রিল। তখন ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। একইভাবে অকটেনের দাম বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রোলের দাম ১৩৫ এবং কেরোসিনের দাম ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এর দেড় মাসের মাথায় ৩১ মে আবার ডিজেল, অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিনের দাম প্রতি লিটারে পাঁচ টাকা করে বাড়ানো হয়। সর্বশেষ গত রোববার সব জ্বালানি তেলের যে দাম বাড়ানো হলো, তা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ। ইউক্রেনযুদ্ধের কারণে ওই বছর জ্বালানি তেলের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪২ শতাংশ বাড়ানো হয়। এবার ইরানযুদ্ধের কারণে দফায় দফায় দাম বাড়ানো হয়েছে বা হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে আমাদের দেশ বিদেশনির্ভর। বাংলাদেশ পেট্রলিয়াম করপোরেশন সূত্র মতে, দেশে প্রতিবছর বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে ৭৫-৮০ লাখ টন। এবারের চাহিদা ৭৫ লাখ টনের মতো, যার ৭৫ শতাংশই ডিজেল।
অন্যান্য তেল ২৫ শতাংশ। যেহেতু জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে আমরা বিদেশের ওপর নির্ভরশীল, সেহেতু যুদ্ধ বা অন্য কোনো কারণে উৎপাদন ও আমদানি ব্যাহত হলে আমাদের মতো দেশগুলোই সবচেয়ে সংকটজনক অবস্থায় পতিত হয়। ইরানযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তেল ও গ্যাস পরিবহনে যে বাধা ও প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়, তাতে সব দেশেই তেলের সংকট হয় এবং দামও বেড়ে যায়। জানা যায়, ইরানযুদ্ধের কারণে গত মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ও জাহাজভাড়া বেড়ে যায়। এমতাবস্থায়, জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়ে যায়। বাংলাদেশ পেট্রলিয়াম করপোরেশনের হিসাবে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান দিতে হয়েছে। দাম বাড়নোর ফলে লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভবপর হবে বলে জ্বালানি বিভাগের দাবি।
লোকসান কমলেও জ্বালানি তেলের যে বর্ধিত দাম নির্ধারিত হয়েছে, তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া কিন্তু জীবনের সকল ক্ষেত্রেই কমবেশি পড়বে। তেলে বিদ্যুৎকেন্দ্র চলে। ফলে, বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বাড়বে। তেলে যানবাহন চলে। যানবাহনে যাত্রী ও মালামাল পরিবাহিত হয়। ফলে, যাত্রী ও মামালালের ভাড়া বাড়বে। এতে পণ্যমূল্যও বাড়বে। জ্বালানি হিসাবে কলকারখানার উৎপাদনেও তেলের ব্যবহার আছে। ফলে, পণ্য উৎপাদনের খরচ বাড়বে। তেলচালিত সেচযন্ত্রের ব্যবহার বিদ্যুৎ চালিত সেচযন্ত্রের পরেই। ফলে, সেচের খরচ বাড়লে কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। মূল্যস্ফীতি এখন ৮/৯ শতাংশের ওপর। এরপর তা আরো কয়েক শতাংশ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশনের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেছেন, সরকার এর আগে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে।
এখন তেলের দাম বাড়ালো। এরপর হয়তো গ্যাসের দামও বাড়ানো হবে। তখন মানুষের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। বলা বাহুল্য, এখনই মানুষের টিকে থাকা অসম্ভবপ্রায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাল, ডাল, আটা, ময়দা, তেল, মাছ, গোশত, ডিম, দুধ, শাকসবজি, তরিতরকারিসহ এমন কোনো পণ্য ও মশলাপাতি নেই, যার দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়-সামর্থের বাইরে না চলে গেছে। মানুষের আয় বাড়েনি। খরচ বেড়েছে। ফলে, তাদের পক্ষে প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী এবং জিনিসপত্র কেনা সম্ভব হচ্ছে না। চার ভাগের এক ভাগ কিংবা অর্ধেক পণ্য কিনতে তাদের বাধ্য থাকতে হচ্ছে। এহেন পরিস্থিতিতে দারিদ্র্য ও পুষ্টিহীনতা তাদের ভাগ্য লিখনে পরিণত হয়েছে। দরিদ্রজনের সংখ্যা ইতোমধ্যে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। তাদের সংখ্যা যে আগামীতে আরো বাড়বে তার আলামত এখন বিভিন্নভাবে দেখা যাচ্ছে। যে কোনো সরকারের প্রধান লক্ষ্য থাকে মানুষের জীবনযাপনকে সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ করা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দুঃখের বিষয়, এ দু’ক্ষেত্রেই সরকার অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। পণ্যমূল্য অব্যাহতভাবে বাড়ছে। অন্যদিকে নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার ধারাবাহিক অবনতি ঘটছে। উভয় ক্ষেত্রে মানুষ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শেষ নেই।
বাস্তবতার আলোকে একথা স্বীকার করতেই হবে যে, সরকার নিতান্ত বাধ্য হয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। সবদেশই বাড়িয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকা, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রভৃতি কোনো দেশই বাদ যায়নি। অন্যদিকে আমাদের প্রতিবেশী ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান প্রভৃতি দেশেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। ভারতের কলকাতায় ডিজেলের প্রতি লিটারের দাম ১৩৫ টাকা, মিয়ানমারে ১৬৫ টাকা, নেপালে ১৬১ টাকা, শ্রীলংকায় ১৭৯ টাকা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা এবং পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা। লক্ষ করার বিষয়, প্রতিবেশী দেশগুলোতে তেলের দাম তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে ওইসব দেশে, বিশেষ করে ভারতে ও মিয়ানমারে তেল পাচারের সমূহ আশংকা রয়েছে। ফলে পাচার প্রতিহত করতেও তেলের দাম বাড়ানোর দরকার ছিল। তবে দাম বাড়িয়েই সরকারকে দায় সারলে হবে না।
তেলের দাম বাড়ার অনিবার্য প্রতিক্রিয়া কী করে সফলভাবে মোকাবিলা করা যায়, সে চিন্তাভাবনাও তাকে করতে হবে। একই সঙ্গে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তেলের সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। যানজট নিরসনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তেলের অপচয় কম হয়। সরকারিভাবে সংযম প্রদর্শন করতে হবে, যাতে অধিক যানবাহন ব্যবহারের ফলে বাড়তি তেলের খরচ না হয়। বেসরকারি বা ব্যক্তি পর্যায়েও সংযম দেখাতে হবে। বাস্তবতার নিরিখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ অসম্ভব হবে না বলে পর্যবেক্ষকরা আশা করেন।
লেখক: শ্যামল শীল
সাবেক জবি শিক্ষার্থী ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা।