মেহেদী হাসান: খুলনা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান পদে অধ্যাপক ডা. মো. জহিরুল হককে দায়িত্ব দেওয়ার প্রতিবাদে কর্মবিরতিতে গেছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হলরুমে জরুরি বৈঠক শেষে তারা এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অভিযোগ, ডা. জহিরুল হক আওয়ামী লীগপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাচিবের কেন্দ্রীয় নেতা ও আজীবন সদস্য এবং জুলাই আন্দোলনের সময় আন্দোলনবিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব দেওয়ার আদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন তারা। তবে ডা. জহিরুল হক এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি ‘ডানপন্থী’ হলেও স্বাচিবের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।খুলনা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আমানুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ২৪ সেপ্টেম্বরের অফিস আদেশে বলা হয়, মেডিসিন বিভাগের বর্তমান বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এ বি এম সাইফুল আলম আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাবেন। তাঁর শেষ কর্মদিবসে মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক (চলতি দায়িত্ব) ডা. মো. জহিরুল হকের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে তাকে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়। এই আদেশ প্রকাশের পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের আহ্বায়ক ডা. মো. মিরাজ হোসাইন বলেন, আমরা এই আদেশ প্রত্যাখ্যান করছি। অবিলম্বে আদেশ বাতিল করতে হবে। আদেশ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে।তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই আন্দোলনের সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নিয়ে অযাচিত মন্তব্য ও আন্দোলনবিরোধী অবস্থানের অভিযোগ রয়েছে এমন একজন চিকিৎসককে মেডিসিন বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান করা উচিত নয়।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে ডা. জহিরুল হককে ‘স্বাচিবের কেন্দ্রীয় নেতা ও আজীবন সদস্য’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি তার একাডেমিক ও পেশাগত অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। তাদের দাবি, ২০২২ সালে এফসিপিএস (মেডিসিন) সম্পন্ন করার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অভিযোগের বিষয়ে অধ্যাপক ডা. মো. জহিরুল হক বলেন, আমি ডানপন্থী লোক। স্বাচিবের লোকাল লিস্টে আমার নাম রয়েছে, তবে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কোথাও আমার নাম নেই। আমি কখনো স্বাচিবের সঙ্গে ছিলাম না।তিনি বলেন, কলেজ কর্তৃপক্ষের অফিস আদেশের মাধ্যমে তাকে মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।ডা. জহিরুল হকের দাবি, এ পদে তার একজন প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছেন এবং তিনি দায়িত্বটি পাওয়ার জন্য চেষ্টা করছেন। তার ইন্ধনেই কিছু জুনিয়র চিকিৎসক কর্মবিরতিতে গেছেন বলে তিনি মনে করেন।তিনি আরও জানান, তার বক্তব্যের সমর্থনে কিছু নথিপত্র ও কাগজপত্র রয়েছে এবং সেগুলো হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাবেন। তবে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে নথিপত্র পাঠানোর কথা বলার পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এসব নথিপত্র পাঠাননি।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের জরুরি বৈঠকে বক্তব্য দেন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ড্যাবের কোষাধ্যক্ষ ডা. শফিউল আলম ডেভিড, ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের আহ্বায়ক ডা. মো. মিরাজ হোসাইন, সদস্য সচিব ডা. এস এম কামরান হোসেন এবং ছাত্রদল নেতা মো. ইয়ারুল হুসাইন। বৈঠক শেষে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা দেন।কর্মবিরতির প্রভাব পড়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে। শনিবার দুপুরে মেডিসিন বিভাগের ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি দেখা যায়। দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটের দিকে ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডেও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের জন্য নির্ধারিত চেয়ার-টেবিল ফাঁকা পড়ে থাকতে দেখা যায়। সার্জারিসহ হাসপাতালের অন্যান্য ওয়ার্ডেও কর্মবিরতির প্রভাব পড়ার কথা জানা গেছে। ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতিতে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ভোগান্তি ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তারা দ্রুত বিষয়টির সমাধান করে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তবে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতির মধ্যেও হাসপাতালের সরকারি চিকিৎসকরা নিয়মিত চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ডেঙ্গুর এই সময়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতির কারণে হাসপাতালে রোগীদের ব্যাপক ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।এদিকে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা তাদের দাবি থেকে সরে আসেননি। বিভাগীয় প্রধান হিসেবে ডা. মো. জহিরুল হককে দায়িত্ব দেওয়ার আদেশ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।