প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ৯, ২০২৬, ২:০৫ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ৯, ২০২৬, ১২:১১ অপরাহ্ণ

কামাল উদ্দিন: ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের চেনা কোলাহল, যানজট, মানুষের ছুটে চলা আর প্রতিদিনের অসংখ্য ব্যস্ততার মাঝেও হঠাৎ মনে হলো, একটু থামা দরকার। একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ানো দরকার নিজের কাছাকাছি। তাই ক্লান্ত শরীর আর কিছু অগোছালো ভাবনা সঙ্গে নিয়ে চলে গেলাম আফতাবনগরের কাশফুলের বাগানে।
বিকেলের সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। কখনো সোনালি রোদ মাটিতে নেমে আসছে, আবার মুহূর্তেই মেঘ এসে সেই আলোকে আড়াল করে দিচ্ছে। আকাশজুড়ে যেন রোদ আর মেঘের এক নীরব লুকোচুরি খেলা। কখনো মনে হচ্ছে শরতের নির্মল বিকেল, আবার পরক্ষণেই মনে হচ্ছে বৃষ্টি নামবে বুঝি। ঢাকার আকাশও আজ যেন নিজের মন ঠিক করতে পারছে না।
আর সেই অনিশ্চিত আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি সাদা কাশফুল।
দূর থেকে মনে হলো, শহরের বুকের মধ্যে কেউ যেন এক টুকরো সাদা মেঘ এনে বিছিয়ে রেখেছে। বাতাস এলেই কাশফুলের শুভ্র শীষগুলো একসঙ্গে দুলে উঠছে। কখনো মাথা নত করছে, কখনো আবার বাতাসের সঙ্গে বুক উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকছে। তাদের সেই দোল খাওয়া দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, প্রকৃতি খুব বেশি কথা বলে না, কিন্তু তার নীরবতার মধ্যেই কত গল্প জমে থাকে!
কাশফুলের কাছে আজ মানুষেরও কমতি ছিল না। কেউ এসেছে প্রিয়জনকে নিয়ে, কেউ বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে, কেউবা পরিবারের ছোট্ট সদস্যদের হাত ধরে। কেউ ছবি তুলছে, কেউ হাসছে, কেউ কাশফুলের ভেতর দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। কারও হাতে মোবাইল, কারও চোখে আনন্দ, কারও মুখে দীর্ঘদিন পর পাওয়া অবকাশের প্রশান্তি।
কেউ কাউকে চেনে না, অথচ সবাই যেন একই আনন্দের অংশীদার। অচেনা মানুষের এই ভিড়ের মধ্যেও আমার চোখ বারবার থেমে যাচ্ছিল মানুষের মুখে। কত রকম মুখ! কত রকম জীবন! প্রত্যেকের চোখের আড়ালে হয়তো আলাদা একটি গল্প, আলাদা একটি অপেক্ষা, আলাদা কোনো না বলা কষ্ট কিংবা ছোট্ট কোনো সুখ লুকিয়ে আছে। অথচ বাইরে থেকে সবাই একই রকম স্বাভাবিক। এটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় অভিনয়।
কেউ জানে না, পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষটির বুকের ভেতর কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে। কেউ জানে না, যে মানুষটি একটু আগে হাসিমুখে ছবি তুলল, তার রাত হয়তো কাটে দীর্ঘশ্বাসে। আবার যে মানুষটিকে খুব সাধারণ মনে হয়, তার জীবনেই হয়তো জমে আছে অসাধারণ কোনো গল্প।
লেখক মানুষ বলে হয়তো এসব দৃশ্য একটু অন্যভাবে দেখি। আমার কাছে কাশফুল শুধু কাশফুল নয়। একটি অচেনা মুখ শুধু অচেনা মুখ নয়। একটি বিকেল শুধু বিকেল নয়। সবকিছুর মধ্যেই যেন কোনো না কোনো গল্প লুকিয়ে থাকে।
আজও কিছু আপন মানুষের মুখোমুখি হয়েছি, কিছু অচেনা মানুষের পাশ দিয়ে হেঁটেছি। কেউ হয়তো জানে আমি কে, কেউ হয়তো কোনোদিন জানবেও না। কিন্তু কয়েকটি মুহূর্তের জন্য সবাই মিলে যেন একই বিকেলের গল্পের চরিত্র হয়ে গেলাম।
আমি চুপচাপ বসে ছিলাম। চারপাশে কাশফুল দুলছে। বাতাস কখনো কোমল, কখনো একটু অস্থির। দূরের আকাশে মেঘ জমছে। তার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে কাশফুলের সাদা শরীরে পড়ছে। মনে হচ্ছিল, সাদা ফুলগুলো যেন নিজের ভেতরেই আলো জমিয়ে রেখেছে।
ক্লান্ত শরীর তখন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসছে। সারাদিনের ব্যস্ততা, নানা মানুষের সঙ্গে কথা বলা, দায়িত্ব, কাজ, চিন্তা, লেখালেখি, জীবনের নানা হিসাব সবকিছু যেন একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আজ কোনো হিসাব করতে হবে না। কোনো উত্তর খুঁজতে হবে না। শুধু বসে থাকতে হবে।
কখনো কখনো মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত প্রয়োজন হয়, যেখানে কোনো উদ্দেশ্য থাকে না। কোথাও পৌঁছানোর তাড়া থাকে না। কারও সঙ্গে প্রতিযোগিতা থাকে না। শুধু নিজের সঙ্গে নিজের একটু দেখা হয়।
আজকের বিকেলটি আমার কাছে তেমনই একটি বিকেল। আফতাবনগরের কাশবাগান হয়তো অনেকের কাছে নিছক বিনোদনের জায়গা। কিন্তু একজন লেখকের চোখে এটি হয়ে উঠতে পারে একটি চলমান উপন্যাস। এখানে প্রতিটি মানুষ একটি চরিত্র, প্রতিটি মুখ একটি অধ্যায়, প্রতিটি হাসি একটি বাক্য, আর প্রতিটি নিঃশব্দতা একটি অসমাপ্ত গল্প।
মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল, কাশফুলগুলো যেন আমাকে বলছে, “এতদিন ধরে অন্যের গল্প লিখেছ, আজ একটু নিজের গল্পটাও লেখো।”
হয়তো সেই কারণেই আজকের এই বিকেলটাকে মনে রাখার ইচ্ছে হলো। ঢাকার আকাশ তখন আরও মেঘাচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ। মনে হলো, একটু পরেই হয়তো বৃষ্টি নামবে। কিন্তু মানুষ থামছে না। কেউ ছবি তুলছে, কেউ কাশফুলের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে, কেউ দ্রুত বাড়ির পথে ফিরছে। জীবনও তো এমনই। আকাশে যত মেঘই জমুক, মানুষ তার নিজের ছোট্ট আনন্দটুকু খুঁজে নিতে জানে।
আমি ফিরে আসার সময় একবার পেছন ফিরে তাকালাম। সাদা কাশফুলগুলো তখনও বাতাসে দুলছে। তাদের ওপরে ধূসর মেঘ, মেঘের ফাঁকে শেষ বিকেলের সোনালি আলো। মনে হলো, শহরটা যতই ব্যস্ত হোক, তার বুকের কোথাও না কোথাও এখনও একটু নরম জায়গা বেঁচে আছে।
সেই নরম জায়গাটুকুই হয়তো মানুষের বেঁচে থাকার আশ্রয়। আজ তাই আফতাবনগর থেকে শুধু ঘুরে ফিরিনি। সঙ্গে করে নিয়ে ফিরেছি কিছু সাদা কাশফুলের স্মৃতি, কিছু অচেনা মানুষের মুখ, কিছু আপন মানুষের উষ্ণতা, মেঘে ঢাকা আকাশের বিষণ্ন সৌন্দর্য আর নিজের সঙ্গে কাটানো কিছু নীরব মুহূর্ত।
জীবন প্রতিদিন আমাদের অনেক কিছু দেয়, আবার অনেক কিছু কেড়েও নেয়। কিন্তু প্রকৃতি কখনো কখনো বিনা মূল্যে এমন কিছু মুহূর্ত উপহার দেয়, যার কোনো মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। আজকের বিকেলটাও তেমনই এক উপহার।
কাশফুলের সাদা ঢেউয়ের পাশে বসে মনে হলো, বয়স যত বাড়ে, মানুষের চাওয়া তত কমে আসে। একসময় বড় বড় স্বপ্নের ভিড়ে যে শান্তিটুকু খুঁজে পাওয়া যায় না, সেটিই হয়তো কোনো এক পরন্ত বিকেলে, মেঘ আর রোদের লুকোচুরির মধ্যে, সাদা কাশফুলের পাশে বসে হঠাৎ এসে ধরা দেয়। আজ আমি সেই শান্তিটুকুরই একটু স্বাদ নিয়ে ফিরলাম।