মোঃ ইশারাত আলী :সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের পারুলগাছা গ্রামের বিসিআইসি সার ডিলার দীপ্ত ভ্যারাইটিজ স্টোর এন্ড ট্রেডার্স থেকে মেমো বা চালান ছাড়াই শ্যামনগরের কাশিমাড়ি এলাকায় সার পাচারের অভিযোগ উঠেছে। এ সময় ৬ বস্তা ইউরিয়া ও ৪ বস্তা টিএসপি, মোট ১০ বস্তা সার বহনকারী একটি মটরভ্যান আটক করেন স্থানীয় কৃষকরা।
ঘটনাটি শুধু ১০ বস্তা সার আটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং সার পরিবহনের বৈধ কাগজপত্র কোথায়, ডিলারের মজুত ও বিক্রির হিসাব কী, গত মার্চে ১০০টি মেমোর অস্পষ্টতার অভিযোগ কীভাবে তৈরি হলো এবং ঘটনাস্থলে অবহিত করার পরও কৃষি বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার উপস্থিতি কেন নিশ্চিত হলো না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের কোমরপুর গ্রামের রাস্তা দিয়ে সারগুলো শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ি ইউনিয়নের সার ডিলার মো. আবুল বাশারের গোডাউনে নেওয়া হচ্ছিল। তাদের সন্দেহ হলে ভ্যানটি থামিয়ে সারগুলো আটক করা হয়।
সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে এ প্রতিবেদক মটরভ্যান চালক রুহুল আমিনের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, ৪ বস্তা টিএসপি ও ৬ বস্তা ইউরিয়া পারুলগাছার সার ডিলার মৃণাল কান্তি মন্ডলের কাছ থেকে নিয়ে শ্যামনগরের ডিলার আবুল বাশারের কাছে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন। তার কাছে সার পরিবহনের কোনো মেমো বা চালান ছিল না বলেও জানান তিনি।
এদিকে বিষয়টি জানতে সকাল ৮টা ২০ মিনিটে বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি পরিদর্শক মাহফুজুর রহমানকে ফোনে জানানো হয়। তিনি ঘটনাস্থলে আসছেন বলে জানান। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, পরবর্তী প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই কাশিমাড়ির সার ডিলার আবুল বাশারের লোকজন কোমরপুর মোড় থেকে ভ্যানটি নিয়ে চলে যান।
কৃষকদের অভিযোগ, এ সময় তাদের দেখে নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। ফলে সারগুলো কোথায় গেল, কার নির্দেশে নেওয়া হলো এবং কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়া এক ডিলারের এলাকা থেকে অন্য উপজেলার ডিলারের কাছে সার পরিবহনের অনুমোদন ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে সার ডিলার মৃণাল কান্তি মন্ডলের বক্তব্যে। তিনি দাবি করেন, ওই সার তার কাছ থেকে নেওয়া হয়নি। তবে তার কাছে থাকা ২২০০-২৩০০ সিরিয়ালের ১০০টি মেমো কোথায় গেল, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত মার্চ মাসেও মৃণাল কান্তি মন্ডল প্রায় ১০০ জন কৃষকের কাছে মেমো ছাড়া এবং উচ্চমূল্যে সার বিক্রি করেছেন। ওই বিক্রির কোনো মেমো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলেও তারা দাবি করেন। উপসহকারী কৃষি পরিদর্শক মাহফুজুর রহমানের সামনে বিষয়টি প্রমানিত হলেও তিনি কোন পদক্ষেপ নেননি।
বিষয়টি নিয়ে উপসহকারী কৃষি পরিদর্শক মাহফুজুর রহমানকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি তিনি অবহিত হয়েছেন। মেমো ছাড়া ১০০ জন কৃষকের কাছে কীভাবে সার বিক্রি করা হলো, সে বিষয়ে ডিলারকে জিজ্ঞাসা করেছেন। সন্তোষজনক জবাব না পেলে সার ডিলার ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)কে নিয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কথাও জানান তিনি।
তবে স্থানীয় কৃষকদের একাংশের অভিযোগ, ঘটনার পর কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সার জব্দ, মজুত যাচাই কিংবা কাগজপত্র পরীক্ষা করার দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। বরং বিষয়টি নিয়ে গড়িমসির অভিযোগ উঠেছে। তারা কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ডিলারের যোগসাজশের অভিযোগ তুললেছেন। তবে তারা বিষয়টি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়ার দাবী করেছেন।
বর্তমানে সার সংকটের কারণে অনেক কৃষক প্রয়োজন অনুযায়ী জমিতে সার দিতে পারছেন না বলে অভিযোগ করছেন। এমন পরিস্থিতিতে একটি বিসিআইসি ডিলারের বিক্রিত বা মজুত সার অন্য উপজেলার ডিলারের কাছে মেমো-চালান ছাড়া যাওয়ার অভিযোগ নতুন করে বিতরণব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত নির্দেশনায় ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে সার বিতরণে রশিদ ছাড়া সার বিক্রি না করার বিষয়টি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ডিলারের গুদাম পরিদর্শন করে সারের মজুত ও সরবরাহের কাগজপত্র যাচাই এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশনাও রয়েছে।
সার ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৬ কৃষিকাজে ব্যবহৃত সারের সংরক্ষণ, বিতরণ, বিপণন, পরিবহন ও বিক্রয় নিয়ন্ত্রণের আইনি কাঠামো নির্ধারণ করেছে। সেকারনে এই ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তারা প্রশ্ন করেছে ১০ বস্তা সার যদি মৃণাল কান্তির কাছ থেকে না নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ভ্যানচালক রুহুল আমিন কার কাছ থেকে সার পেয়েছিলেন? সারগুলো শ্যামনগরের ডিলার আবুল বাশারের গোডাউনে যাচ্ছিল কি?, তা তদন্ত করে দেখা হবে কি? ভ্যানচালকের কাছে কেন কোনো মেমো বা চালান ছিল না? মৃণাল কান্তির ২২০০-২৩০০ সিরিয়ালের ১০০টি মেমোর হিসাব কোথায়? গত মার্চে ১০০ কৃষকের কাছে মেমো ছাড়া সার বিক্রির অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হয়েছে কি না? ডিলারের স্টক রেজিস্টার, বিক্রয় রেজিস্টার ও মজুত সরেজমিনে মিলিয়ে দেখা হয়েছে কি? কৃষি কর্মকর্তাকে সকাল ৮টা ২০ মিনিটে অবহিত করার পরও কেন এক ঘণ্টার মধ্যে ভ্যানটি ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়া হলো? সারগুলো যদি বৈধভাবে পরিবহন করা হয়ে থাকে, তাহলে পরিবহনের কাগজপত্র কোথায়?
অভিযোগগুলোর বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়াসিম উদ্দীনের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে জানতে চাওয়া হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
তবে অভিযুক্ত ডিলার মৃণাল কান্তি মন্ডল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং উপসহকারী কৃষি পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান জানিয়েছেন, বিষয়টি তিনি অবহিত হয়েছেন এবং প্রয়োজন হলে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।
ফলে এখন কৃষকদের তরফে প্রশ্ন উঠেছে, ১০ বস্তা সার কোথা থেকে এলো, কার কাছে যাচ্ছিল এবং মেমো-চালান ছাড়া এই পরিবহন কীভাবে হলো?
কৃষকের প্রয়োজনের ভর্তুকিযুক্ত বা নিয়ন্ত্রিত সার যদি নির্ধারিত ব্যবস্থার বাইরে চলে যায়, তাহলে শুধু একজন ডিলারের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত যথেষ্ট নয়। সার বরাদ্দ থেকে গুদাম, বিক্রির রেজিস্টার, মেমো এবং পরিবহন পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থার হিসাব মিলিয়ে দেখা জরুরি। তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে, ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন অনিয়ম, নাকি এর পেছনে আরও বড় কোনো সরবরাহচক্র কাজ করছে।