মোঃ ইশারাত আলী, (কালিগঞ্জ )ব্যুরো:বর্ষা মৌসুমের এই মধ্যবর্তী সময়েও সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার স্থায়ী সংকট কাটেনি; বরং লাগাতার বর্ষণে উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের হাজার হাজার কৃষক ও মৎস্যঘের মালিকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হয়েছে। নদ-নদীতে জোয়ার স্বাভাবিক থাকলেও প্রভাবশালী মহলের অবিরত দখলদারিত্ব, অপরিকল্পিত ঘের ব্যবস্থাপনা এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপের দীর্ঘসূত্রতার কারণে উপজেলার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এখনো কার্যত অচল হয়ে আছে। এছাড়া পানি নিষ্কাশনের প্রধান অবকাঠামো হিসেবে পরিচিত ৪১টি স্লুইজ গেটের অধিকাংশই জরাজীর্ণ ও অকেজো পড়ে থাকায় বৃষ্টির পানি নামতে না পেরে তলিয়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও মৎস্যঘের।
স্থানীয় ও পাউবো সূত্রে ২৭ জুলাই (মঙ্গলবার) জানা গেছে, ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে নির্মিত এখানকার অধিকাংশ স্লুইজ গেটের প্রস্থ মাত্র ৫ থেকে ৬ ফুট এবং দুই পাশে কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকায় এগুলো যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি অপ্রতুল। নিয়মিত সংস্কার ও আধুনিকায়নের অভাবে এগুলো পানি চলাচলের উপযোগী নয়।
অপরিকল্পিত ঘের ব্যবস্থার কারণে কৃষিজমিতে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। প্রভাবশালী ঘের মালিকদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। আদি যমুনা, কাঁকশিয়ালী, ইছামতি, কালিন্দি ও গলঘেষিয়া নদীর সঙ্গে সংযুক্ত ছোট-বড় শতাধিক খালের একটি বড় অংশ আজও জবরদখলে রয়েছে। ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অনেক খালের শ্রেণি পরিবর্তন করে ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড ও প্লট আকারে বিক্রি করার অভিযোগও পুরনো।
গত বছর তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনুজা মন্ডল কিছু খাল পরিদর্শনের পর উচ্ছেদ অভিযানের উদ্যোগ নিলেও তাঁর বদলির পর সেই কার্যক্রম থমকে যায়। যদিও সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাল খননের ঘোষণার পর পানি উন্নয়ন বোর্ড (৩৩টি), এলজিইডি (১১টি) এবং বিএডিসি (১৬টি) কিছু খালের তালিকা তৈরি ও খননকাজ পরিচালনা করছে, তবে স্থানীয়দের মতে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। এখনো শতাধিক খাল ও প্রায় ৫০টি স্লুইজ গেট সম্পূর্ণ অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।
কুলতলী থেকে কাঁকশিয়ালী নদী ও গলঘেষিয়ার কালিকাপুর পর্যন্ত প্রায় ৬১ কিলোমিটার এবং কালিগঞ্জ সদর থেকে বাঁশতলা ব্রিজ পর্যন্ত ২৭ কিলোমিটার নদীপথের দুই পাশের প্রায় ৫০টি ছোট-বড় খাল এবং ১০টির বেশি স্লুইজ গেটের অধিকাংশই এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। বিলগুল্লি, মাচুর, খারহাট, সুইলপুর, সাতবসু, খাঞ্জিয়া, বসন্তপুর, গোলখালী, আমিয়ান, আমবাড়ি, তাড়ালী, তেতুলিয়া, ঘুশুড়ী, বরেয়া, সুন্দরখালী, হাড়দ্দা, ডেমরাইল, বাহাদুরপুর, কুলতলী, পরাণপুর, উত্তর শ্রীপুর, গোবিন্দকাঠি, কুমারখালী, ইউসুফপুর, কালিকাপুর সাপখালী, ঝুরঝুরিয়া, পুটিমারি, শুকরোখালী, ঝাউতলী, নিমতলী, সন্ন্যাসীর চক, বালিয়াডাঙ্গা, জালালতলা, সন্ধ্যার খাল, ঝপঝুপিয়া ও বাগারখালীসহ সকল খাল উন্মুক্ত করার দাবি দীর্ঘদিনের।
ঠেকরা গ্রামের হারুন অর রশিদ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, এলজিইদির একটি সড়ক নির্মাণের সময় প্রায় ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি গুরুত্বপূর্ণ খালের মুখ বন্ধ করে দেওয়ায় প্রতিবছর বর্ষায় মৎস্যঘের ও কৃষিজমি দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছে। তারালী ইউনিয়নের গোলখালী গ্রামের আব্দুস ছাত্তার ও ঘের ব্যবসায়ী জিন্নাত আলী খান জানান, কাঁকশিয়ালী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত আমিয়ান ও গোলখালী খালসহ অন্যান্য খাল পুনঃখনন না করায় শুকনো মৌসুমে যেমন পানি তোলা যায় না, তেমনি বর্ষায় পানি নিষ্কাশিত না হয়ে মাছ ভেসে গিয়ে লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। ফতেপুর গ্রামের শাহাদাৎ হোসেন গলঘেষিয়া নদীর সঙ্গে সংযুক্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ খালের মুখ বন্ধ থাকায় নদীটির নাব্যতাও মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে বলে উল্লেখ করেন।
কালিগঞ্জের নদী-খাল নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা অ্যাডভোকেট জাফর উল্যাহ ইব্রাহিম বলেন, একসময় শতাধিক খাল কালিগঞ্জের পাঁচটি নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রাকৃতিকভাবে পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করত। কিন্তু দখল, ভরাট ও অবৈধ বন্দোবস্তের কারণে আজ সব নদীর অস্তিত্ব সংকটাপন্ন। জলাবদ্ধতা চিরতরে দূর করতে অবিলম্বে সব দখল উচ্ছেদ করে খালগুলো পুনঃখনন করা জরুরি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কালিগঞ্জ পওর উপ-বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইমরান হোসেন সরদার জানান, "আমরা ইতোমধ্যে কালিগঞ্জের ৩৩টি খালের তালিকা দিয়েছি এবং পর্যায়ক্রমে খননকাজ চলছে। পুরোনো রেগুলেটর ও স্লুইজ গেটগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কারও করা হচ্ছে। সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিক এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দ্রুতই জলাবদ্ধতা কমে আসবে বলে আমরা আশাবাদী।"