
মো. ইশারাত আলী : সরকারি খাদ্য গুদামে কৃষকের উৎপাদিত ধান ন্যায্যমূল্যে ক্রয়ের উদ্দেশ্যে পরিচালিত সরকারি কর্মসূচি কালিগঞ্জে গুরুতর অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগে উঠেছে।
লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, সরকারি ধান সংগ্রহকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা প্রকৃত কৃষকদের বঞ্চিত করে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি, অ-কৃষক ও মহাজনদের মাধ্যমে সরকারি সুবিধা ভোগ করছে। অভিযোগে উপজেলা কৃষি অফিস ও খাদ্য বিভাগের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যোগসাজশের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে কালিগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৫৪ হাজার বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। সরকারিভাবে ৭০৪ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এখন পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৩৫০ টন। বাকি ৩৫৪ টন ধান সংগ্রহকে কেন্দ্র করেই অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী কৃষক ও লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, সরকারি গুদামে ধান সরবরাহের সুযোগ পেতে প্রতি কেজি ধানে ২ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত অবৈধ অর্থ লেনদেন হচ্ছে। অভিযোগের হিসাব অনুযায়ী, পুরো সংগ্রহ কার্যক্রমে শুধু এই খাত থেকেই প্রায় ১৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা অবৈধভাবে আদায়ের আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে মহাজনরা সরকারি গুদামে বেশি দামে বিক্রি করছেন।
চলতি মৌসুমে ১১ হাজার ৭৩৩টি বস্তা ধানের হিসাবে এই অনৈতিক মুনাফার পরিমাণ প্রায় ৬৫ লাখ টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে সরকারি ধান সংগ্রহকে কেন্দ্র করে প্রায় ১ কোটি টাকার অনিয়ম ও অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী একজন কৃষকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার কেজি ধান কেনার বিধান থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, বসন্তপুর খাদ্য গুদামে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছ থেকে এককালীন ৪ থেকে ১৫ টন পর্যন্ত ধান গ্রহণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মথুরেশপুর, মৌতলাসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের কৃষক তালিকায় প্রকৃত কৃষকদের পরিবর্তে কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এমন ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগও উঠেছে। এর ফলে প্রকৃত কৃষকরা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, উৎপাদনের সময় চড়া দামে সার, বীজ, সেচ ও শ্রমিকের খরচ বহন করেও তারা সরকারি গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে কম দামে ফড়িয়া ও মহাজনদের কাছে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে সরকারি কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে বলে তারা দাবি করেন।এসব অভিযোগ তুলে কাজী আবু সাঈদ সোহেল জেলা প্রশাসন, খাদ্য অধিদপ্তর ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ কামনা করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
কালিগজ্ঞ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি করে কৃষি কর্মকর্তা ও খাদ্য কর্মকর্তাকে সদস্য করে গঠিত কমিটি কৃষকদের আবেদন নিয়ে তালিকা প্রস্তুত করেছেন । এ ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘুষ বানিজ্যের দায় এড়াতে পারেন না ।
অভিযোগের বিষয়ে বসন্তপুর খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, "আমি সরকারি নিয়ম মেনেই ধান ক্রয় করছি। এখানে কোনো ঘুষ লেনদেন হচ্ছে না। আমরা সর্বোচ্চ ধান সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কেনার চেষ্টা করছি।
কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিলন সাহা বলেন,অভিযোগটি আমি গ্রহণ করেছি।বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে এবং নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে কৃষক তালিকা পুনঃযাচাই, প্রকৃত কৃষকদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। তাদের মতে, তা না হলে কৃষকবান্ধব এই কর্মসূচির প্রতি মানুষের আস্থা আরও ক্ষুণ্ন হবে এবং প্রকৃত কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।