
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলায় সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুদ থাকা সত্ত্বেও কৃষকদের বাড়তি দামে সার কিনতে হচ্ছে। কখনো “সার নেই” অজুহাত, আবার কখনো অতিরিক্ত মূল্য আদায়-এটাই এখন কৃষকদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিসিআইসি ও বিএডিসির সার বিতরণকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী ডিলার সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। এই সিন্ডিকেটের কারসাজিতে কৃষকরা পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে, বাধ্য হচ্ছেন নির্ধারিত দামের চেয়ে চড়া মূল্যে সার কিনতে। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে উপজেলা কৃষি অফিসের তদারকি ও ভূমিকা নিয়ে। কৃষি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ সার নিয়ে এ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি চলতে থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে কৃষক মহলে। তারা সরাসরি সার কেলেংকারির অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছে কৃষি কমকর্তাদের উপর।
কালিগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণশ্রীপুর ইউনিয়নের শ্রীকলা গ্রামের কৃষক হাফিজুর রহমান। প্রতিবছর তিনি তিন বিঘা জমিতে শীতকালীন বোরো ধান চাষ করে আসছেন। চলতি মৌসুমে ডিএপি সারের প্রয়োজন হলে তিনি দক্ষিণশ্রীপুর ইউনিয়নের অনুমোদিত ডিলার আবু বক্কার টুনুর কাছে সার কিনতে যান। এক বস্তা ডিএপি সার নেওয়ার কথা জানাতেই ডিলার স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, তিনি ২০ কেজির বেশি সার দেবেন না। এর কারণ জানতে চাইলে কৃষক হাফিজুর রহমানের উপর চড়াও হন।
এ সময় ডিলার তার সঙ্গে উচ্চবাচ্যে কথা বলেন বলেও অভিযোগ করেন ওই কৃষক। অগত্যা উপায় না পেয়ে হাফিজুর রহমান এই প্রতিনিধির মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে সহযোগিতা চান। সাংবাদিককে তিনি জানান, এক বস্তা ডিএপি সার নিতে হলে কৃষি অফিসারের অনুমতি লাগবে বলে ডিলার তাকে জানায়। পাশাপাশি ডিলারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, ডিএপি সার নিতে হলে আনুষঙ্গিক অন্যান্য সারও বাধ্যতামূলকভাবে কিনতে হবে।
কালিগঞ্জ উপজেলার কুশলিয়া, কৃষ্ণনগর, মৌতলা, বিষ্ণুপুর, দক্ষিণশ্রীপুর, মথুরেশপুর, ধলবাড়িয়া, রতনপুর, ভাড়াশিমলা, নলতা, চাম্পাফুল, তারালী ইউনিয়নের সার ডিলারদের ক্ষেত্রেই একই চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ডিলার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে কৃষকরা একপ্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
ধলবাড়িয়া ইউনিয়নের তেঘরিয়া গ্রামের শ্যামাপদ খাঁর পুত্র পলাশ খাঁ বিসিআইসির অনুমোদিত ডিলার। তিনি ‘মেসার্স মাতৃ এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিক। অভিযোগ রয়েছে, তার স্ত্রী সঙ্গীতা খাঁ একই প্রতিষ্ঠানের নামে বিএডিসির ডিলারশিপ পরিচালনা করছেন। শুধু তাই নয়, একই পরিবারের সদস্য নিমাই খাঁও সার ডিলার হিসেবে যুক্ত রয়েছেন। তারা একটি পরিবারে একাধিক ডিলারশিপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কৃষকদের কাছে একই শর্ত আরোপ করে সার বিক্রি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে, মৌতলা ইউনিয়নে সাইফুল ইসলামের নামে একাধিক ডিলারশিপ থাকার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, এসব ডিলারশিপ কার্যত একই নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হওয়ায় বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং ইচ্ছেমতো দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, এভাবে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে একই পরিবারের হাতে একাধিক ডিলারশিপ কুক্ষিগত রাখার ফলে সরকারি নির্ধারিত মূল্যের কোনো তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকরা, আর প্রশ্নের মুখে পড়ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নজরদারি ও জবাবদিহিতা উপজেলার অনেক কৃষকই সারের সরকারি নির্ধারিত বাজারদর সম্পর্কে অবগত নন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ডিলাররা ইচ্ছেমতো দাম আদায় করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
মৌতলা ইউনিয়নের পানিয়া গ্রামের ধানচাষি জহুরুল আলমের কাছে সরকারি দরে সার বিক্রির মূল্য জানতে চাইলে তিনি তা বলতে পারেননি। তবে তিনি জানান, চলতি মৌসুমে তাকে ইউরিয়া সার কেজি প্রতি ৩০ টাকা, ডিএপি (বাংলা) ৩৫ টাকা, চায়না ডিএপি ৩৫ টাকা এবং পটাশ সার ২৫ টাকা দরে কিনতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, সার কেনার সময় তাকে অতিরিক্তভাবে বীজ বা কীটনাশক কিনতে তাগিদ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একই সময়ে একাধিক সার ডিলারের দোকানে গিয়ে একই ধরনের কথা শুনে খালি হাতে ফিরে আসতে হচ্ছে কৃষকদের। কোথাও “সার নেই”, আবার কোথাও শর্ত সাপেক্ষে বিক্রি-এমন অভিজ্ঞতা কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়াচ্ছে। এতে করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সার বিক্রির অভিযোগ আরও জোরালো হচ্ছে। কৃষকদের দাবি, সরকারি তদারকি জোরদার না হলে এই অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব নয়।
কালিগঞ্জ উপজেলায় সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি ইউনিয়নে একজন করে সার ডিলার এবং প্রতি ওয়ার্ডে একজন করে মোট ১০৮ জন সাব-ডিলার থাকার কথা। কিন্তু এর বাইরে উপজেলায় আরও প্রায় ৪০০ খুচরা সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব খুচরা ব্যবসায়ীর মাধ্যমে কোনো ধরনের অনুমোদন বা নীতিমালা অনুসরণ ছাড়াই কোটি কোটি টাকার সার কেনাবেচা হচ্ছে। উপজেলা কৃষি অফিস এই খুচরা ব্যবসায়ীদের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত থাকলেও কার্যত তাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে পুরো সার বিতরণ ব্যবস্থা চলে যাচ্ছে একটি অবৈধ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে-এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সাব-ডিলার জানান, একটি ইউনিয়নের নির্ধারিত ডিলারের কাছে এক ট্রাকে করে প্রায় ৪০০ বস্তা ডিএপি সার আসে। নিয়ম অনুযায়ী ওই ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের সাব-ডিলারদের প্রত্যেককে ৫ বস্তা করে মোট ৪৫ বস্তা সার দেওয়া হয়। কিন্তু বাকি প্রায় ৩৫৫ বস্তা সার ডিলারের গুদামেই মজুদ থাকে।
অভিযোগ রয়েছে, এই মজুদকৃত সার সময় ও সুযোগ বুঝে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করা হয়। হিসাব অনুযায়ী, ৪০০ বস্তা ডিএপি সার সমান ২০ হাজার কেজি। সরকারি দরে কেজি প্রতি ১৯ টাকা হিসেবে যার মোট মূল্য দাঁড়ায় ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। অথচ সেই একই সার খুচরা পর্যায়ে কেজি প্রতি ৩৫ টাকা দরে বিক্রি হলে মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র ৪০০ বস্তা ডিএপি সারের ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা কৃষকদের পকেট থেকে কেটে নেওয়া হচ্ছে। অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, এই বিপুল অঙ্কের অর্থ ডিলার সিন্ডিকেট ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগাভাগি হচ্ছে।
এই চিত্র শুধু একটি ইউনিয়নের নয়-উপজেলার একাধিক ইউনিয়নে একই কায়দায় সার লুটপাট চলছে বলে দাবি কৃষকদের। সরকারি গুদামে সার থাকা সত্ত্বেও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের জিম্মি করা হচ্ছে, আর প্রশ্নের মুখে পড়ছে উপজেলা কৃষি অফিসের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। শুধু ড্যাব নয় সরকার ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি যা সরকার কৃষকদের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে পৌঁছে দিতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেয়, মূলত আমদানি খরচ থেকে কৃষকের দেওয়া দামের পার্থক্য মিটিয়ে। সেখানে উপজেলা কৃষিঅফিসার ও ডিলারদের যোগসাযোগে কৃষকরা পড়েগ্যোড়াকলে। কৃষকরা বলছেন, দ্রুত কঠোর অভিযান ও নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে এই সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে এবং এর সরাসরি ক্ষতি বহন করতে হবে উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তাকে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কালিগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়াসিম উদ্দিন বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। কালিগঞ্জে সার সংকট হয়নি। তবে পরিস্থিতি এমন হলে তিনি তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নেবো। তিনি আরও বলেন প্রত্যেক দোকানে সরকারী দাম ডিজিটাল ব্যানারে ঝুলানো আছে। আমি নিয়মিত মনিটরিং করতেছি। অভিযোগ থাকলে নির্দিষ্ট করে জানালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তিনি সব প্রশ্নের উত্তর দেননি। উপজেলায় বর্তমানে সারের প্রকৃত মজুত কত? এক ব্যক্তি বা পরিবারের একাধিক ডিলারশিপ বৈধ কি না? অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির দায়ে গত এক বছরে কয়জনের শাস্তি হয়েছে? সিন্ডিকেট ভাঙতে কী কার্যকর অভিযান হয়েছে কিনা? কারা সঠিক ডিলার, সাব ডিলার যা তিনি এড়িয়ে গেছেন। কালিগঞ্জ উপজেলায় সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুদ থাকা সত্ত্বেও কৃষকদের বাড়তি দামে সার কিনতে হচ্ছে। কখনো “সার নেই” অজুহাত, আবার কখনো অতিরিক্ত মূল্য আদায়-এটাই যেন কৃষকদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। এটি পরিণত হয়েছে একটি কাঠামোগত দুর্নীতির চিত্রে। ডিলার নিয়োগ থেকে শুরু করে তদারকি-সব ক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের কার্যক্রম সার (ব্যবস্থাপনা) আইন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯, এবং সরকারি ভর্তুকি নীতিমালা লঙ্ঘন করে। অতিরিক্ত দামে বিক্রি ও জোরপূর্বক পণ্য বিক্রি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেকারনে কৃষকের ন্যায্য অধিকার রক্ষায় দ্রুত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত, ডিলারশিপ বাতিল এবং দায়ী কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নেবে বলে আশঙ্কা সচেতন মহলের।

