প্রতি বছর লাখো তরুণ চোখেমুখে একবুক স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পা রাখে। কিন্তু চার-পাঁচ বছর পর যখন তারা একটি কাগুজে সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে বাস্তব পৃথিবীর মুখোমুখি হয়, তখন সেই রঙিন স্বপ্ন নিদারুণ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। লন্ডনের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তথ্যমতে, দেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতক ডিগ্রিধারী বর্তমানে বেকার। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষ সম্পূর্ণ কর্মহীন অবস্থায় হন্যে হয়ে চাকরির সন্ধানে ঘুরছে। তারুণ্যের এই সীমাহীন অপচয় ও বেকারত্বের অভিশাপ চিরতরে ঘোচাতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখন একটি আমূল কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন।
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কর্মজগতে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করছে। কিন্তু পুঁথিগত বিদ্যা ও প্রায়োগিক দক্ষতার মধ্যে ব্যাপক অসামঞ্জস্য থাকায় তাদের অধিকাংশই যেমন কর্মহীন থাকছে, তেমনি কর্মক্ষেত্রে নিযুক্তরাও দক্ষতার অভাবে নিজেদের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না। এ অবস্থায় আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দক্ষতাভিত্তিক ও প্রায়োগিক জ্ঞান। উচ্চশিক্ষার এই কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে হলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আদি ধারণাকে বিশ্লেষণ এবং বর্তমান সংকটের মূলে তাকাতে হবে। প্রাক-শিল্পযুগের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত অভিজাত শ্রেণির সামাজিকীকরণ এবং তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনের জন্যই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সময়টি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের। ইন্টারনেটের অবারিত কল্যাণে তাত্ত্বিক জ্ঞান এখন সবার হাতের মুঠোয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গতানুগতিক পাঠদান কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে এসে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কারখানায় পরিণত হতে হবে।
আমাদের জাতীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় সদিচ্ছা প্রয়োজন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা দেশের জিডিপির মাত্র ২.০ শতাংশ। এটা ইউনেস্কোর প্রস্তাবিত জিডিপির ৪-৬ শতাংশ এবং মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দের চেয়ে অনেক নিচে। এত অপ্রতুল বরাদ্দ দিয়ে একটি টেকসই শিক্ষা কাঠামো ও বিশ্বমানের মানবসম্পদ আশা করা একপ্রকার অলীক কল্পনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চরম খাদ্যসংকটের মাঝেও জাপান কেবল দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েই ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে বৈশ্বিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল। তারা নিখুঁত পূর্বাভাস করেছিল যে, আগামী ২০ বছরে রাষ্ট্রের ঠিক কোন কোন দক্ষতার প্রয়োজন হবে। আমাদেরও এখন সেই দূরদর্শিতা দেখিয়ে যুগান্তকারী কাঠামোগত মডেলের দিকে এগোতে হবে।
আমাদের দেশের স্নাতক পর্যায়ে তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার পার্থক্য দূর করতে ‘টু প্লাস টু’ (২+২) মডেল প্রবর্তন করা এখন সময়ের দাবি। এই কাঠামোগত সংস্কারের প্রথম ধাপে, অর্থাৎ স্নাতক জীবনের প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষে একজন শিক্ষার্থী কেবল একাডেমিক তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করবে। এই সময়ে শিক্ষার্থী তার বিষয়ের মূল তত্ত্ব, নৈতিকতা এবং বর্তমান বিশ্বের জন্য অপরিহার্য ডিজিটাল লিটারেসি শিখবে। দুই বছর শেষে তাকে একটি ‘অ্যাসোসিয়েট ডিগ্রি’ প্রদান করা হবে। এই ডিগ্রির একটি চমৎকার সামাজিক সুবিধা রয়েছে। ঋণগ্রস্ত বা অসচ্ছল পরিবারের কোনো শিক্ষার্থী চাইলে এ পর্যায়ে একটি সম্মানজনক প্রস্থান নিয়ে অনায়াসেই মিড-লেভেল চাকরিতে প্রবেশ করতে পারবে। ফলে তাকে আর সমাজের চোখে ‘ড্রপআউট’ তকমা নিয়ে ঘুরতে হবে না।
মডেলটির দ্বিতীয় ধাপে, অর্থাৎ তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষে একাডেমিয়া, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সরকারের সমন্বয়ে গঠিত ‘ট্রিপল হেলিক্স’ মডেল পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হবে। শিল্প খাতে প্রবেশের ঠিক আগে শিক্ষার্থীরা পেশাজীবীদের দ্বারা পরিচালিত ডিজিটাল মার্কেটিং বা ফিন্যান্সিয়াল মডেলিংয়ের মতো ৩-৪ সপ্তাহের শর্ট কোর্স সম্পন্ন করবে। এরপর তারা সরাসরি ইন্টার্নশিপ, শিক্ষানবিস বা চুক্তিবদ্ধ চাকরিতে যুক্ত হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এই শিক্ষার্থীদের অর্ধেক বেতনে নিয়োগ দিতে পারবে, যা একদিকে তাদের নিজস্ব নিয়োগ খরচ কমাবে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা প্রথাগত ব্যবস্থার চেয়ে অন্তত দুই বছর আগেই আর্থিকভাবে স্বাধীন হতে পারবে। এই পর্যায়ে স্নাতক কোর্সের অন্তত ৪০ শতাংশ সরাসরি ইন্ডাস্ট্রির বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরিচালিত হবে। উচ্চ বেকারত্বের দেশে বিদ্যমান রূঢ় বাস্তবতায় কেবল তাত্ত্বিক কাঠামোগত পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়; একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রির সফল সমন্বয় নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষকদেরও প্রথাগত তত্ত্বের গণ্ডি ও একাডেমিক আভিজাত্যের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দীর্ঘদিনের আত্মোপলব্ধির জায়গা থেকে বলতে পারি, আমাদের অনেক শিক্ষকেরই ইন্ডাস্ট্রি থেকে বাস্তব জ্ঞান শেখার আগ্রহ বেশ কম। প্রস্তাবিত এই মডেলে শিক্ষকরা যেমন চাকরির বাজারের বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারবেন, তেমনি করপোরেট পেশাদাররাও শ্রেণিকক্ষের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অবগত হবেন। উদাহরণস্বরূপ, বাস্তব অভিজ্ঞতায় একজন কমার্শিয়াল ম্যানেজার ‘এলসি ম্যানেজমেন্ট’ যতটা নিখুঁতভাবে বোঝেন, কেবল বই পড়িয়ে একজন শিক্ষকের পক্ষে তা শিক্ষার্থীদের পুরোপুরি শেখানো অত্যন্ত কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞদের এই পারস্পরিক জানাবোঝাই শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রে সরাসরি ভ্যালু অ্যাড করতে সাহায্য করবে।
পারস্পরিক এই জানাবোঝাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এবং কার্যকর সমন্বয় সাধনের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট টুলসের প্রয়োগ এখন অপরিহার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস কমিটিতে ‘ইন্ডাস্ট্রি অ্যাডভাইজরি বোর্ড’ গঠন, ক্যাম্পাসে সরাসরি কোম্পানির অর্থায়নে যৌথ ইনকিউবেটর ও ল্যাব স্থাপন, বাস্তব সমস্যাভিত্তিক ক্যাপস্টোন প্রজেক্টের প্রচলন এবং অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের ‘অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার চর্চা শুরু করতে হবে। তবে এই সমন্বয়ের পথে কিছু বড় বাধাও রয়েছে। দ্রুত সিলেবাস আপডেটের সুযোগ না থাকা, শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান তৈরির বদলে কেবল গবেষণাপত্রকে প্রাধান্য দেওয়া এবং একাডেমিয়া ও করপোরেট খাতের মাঝে থাকা তীব্র আস্থার সংকট দূর করতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের মাঝে যোগাযোগ ও নেতৃত্বের মতো সফট স্কিলসের চরম অভাব এবং দেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের সঙ্গে কারিকুলামের সংযোগহীনতার মতো ঘাটতিগুলো সমাধান না করলে কোনো তাত্ত্বিক মডেলই বাস্তবে আলো দেখবে না।
এই সামগ্রিক মডেলকে দেশব্যাপী কার্যকর করতে পাঠক্রমের আমূল সংস্কার অপরিহার্য। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি ‘ইউনিফাইড সিলেবাস’ বা অভিন্ন পাঠক্রম থাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে, যেখানে সরকার বিশ্বের সেরা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এসে আউটকাম-বেসড এডুকেশন-নির্ভর কারিকুলাম তৈরি করবে। পাশাপাশি যেসব করপোরেট প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের কাজের সুযোগ দেবে, সরকার তাদের জন্য ১ শতাংশ কর রেয়াতের মতো আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) এখন থেকে কেবল ছাত্র ভর্তির পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং ইন্ডাস্ট্রির সন্তুষ্টির মানদণ্ডে প্রোগ্রামগুলোর অনুমোদন দিতে হবে, যা জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গেও সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আমাদের তরুণরাই দেশের সবচেয়ে বড় ও মূল্যবান সম্পদ। সরকার ও নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, অর্থনীতির আসল চালিকাশক্তি কংক্রিটের চাকচিক্যময় অবকাঠামো নয়; বরং দক্ষ মানবসম্পদ। কালক্ষেপণের কোনো সুযোগ আমাদের আর অবশিষ্ট নেই। এখনই চরম সাহসিকতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার সঙ্গে ‘টু প্লাস টু’ এবং ‘ট্রিপল হেলিক্স’ মডেলের বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। তবেই তরুণদের মেধা ও অদম্য শক্তিকে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিতে রূপান্তরিত করে একটি সত্যিকারের স্বনির্ভর, উন্নত ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
♦ লেখক : শিক্ষাবিদ ও উদ্যোক্তা; পরিচালক, ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (IBA), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়