
মোঃকামালউদ্দীিন:সকাল মানেই তো নতুন সূর্যের আলো, শিশুর হাসি, স্কুলব্যাগ কাঁধে ছোট্ট ছোট্ট পদচারণা। সকাল মানেই বড় বোনের হাত ধরে স্কুলে যাওয়া, মায়ের তাড়া, বাবার স্নেহভরা চোখে বিদায়। একটি শিশুর পৃথিবী কতই না ছোট একটু আদর, কিছু রঙিন স্বপ্ন, কয়েকটি গল্পের বই, আর নিরাপদে বড় হয়ে ওঠার এক অদেখা আশ্রয়।
কিন্তু কখনও কখনও একটি সকাল অদ্ভুতভাবে থেমে যায়। সময় যেন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ায়। একটি শিশুর হাসি হারিয়ে গেলে, শুধু একটি পরিবার নয়—আসলে সমগ্র সমাজই কোথাও না কোথাও আহত হয়। কারণ প্রতিটি শিশু শুধু একটি পরিবারের সন্তান নয়, একটি জাতির ভবিষ্যৎ, একটি দেশের আগামী ভোর।
রামিসা—একটি ছোট্ট নাম, একটি নিষ্পাপ মুখ, একটি অসমাপ্ত গল্প।
সকালে বড় বোনের সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল। হয়তো বইগুলো আগের রাতেই গুছিয়ে রেখেছিল, হয়তো কোনো প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দে ছোট্ট মন উচ্ছ্বসিত ছিল। হয়তো ক্লাসে গিয়ে নতুন কিছু শিখবে, টিফিন ভাগ করে খাবে, বিকেলে বাসায় ফিরে মায়ের পাশে বসে গল্প করবে—এই ছিল তার পৃথিবী। অথচ সেই ছোট্ট পৃথিবী অচিন্তনীয় এক অন্ধকারে হারিয়ে গেল।একজন মা যখন সন্তানের খোঁজে ছুটে বেড়ান, তখন তাঁর হৃদয়ের ভেতরে কত ভয় জন্ম নেয়—তা ভাষায় বোঝানো যায় না। মা শুধু সন্তানকে খোঁজেন না, নিজের শ্বাসকেও খোঁজেন। প্রতিটি মিনিট তখন আতঙ্কের পাহাড় হয়ে দাঁড়ায়। দরজায় কড়া নাড়া, বারবার ডাক, উদ্বেগে চারদিকে ছুটে চলা—এসবের মধ্যে এক মায়ের বুকের কাঁপন কত ভয়ংকর হতে পারে, তা শুধু একজন মা-ই বুঝবেন।
একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের সন্তান। সেই সন্তানকে হারানোর শোক শুধু কান্না নয়, এটি আজীবনের ভাঙন। ঘরের প্রতিটি কোণ তখন স্মৃতির ভারে ভারী হয়ে যায়। স্কুলব্যাগ পড়ে থাকে, বইয়ের পাতায় হাতের লেখা রয়ে যায়, ছোট্ট জামাকাপড় নিঃশব্দে প্রশ্ন করে—“আমি যার ছিলাম, সে কোথায়?”
একজন বাবা হয়তো বাইরে থেকে দৃঢ় থাকার চেষ্টা করেন, কিন্তু গভীর রাতে নিঃশব্দে ভেঙে পড়েন। যে মানুষটি সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন—একদিন বড় হবে, পড়াশোনা করবে, সফল মানুষ হবে—সেই মানুষ হঠাৎ নিজেকে শূন্যতার মধ্যে আবিষ্কার করেন। একজন বাবার বুকের ভেতর যে কান্না জমে, তা অনেক সময় চোখ দিয়েও বের হতে পারে না।আর বড় বোন? যে প্রতিদিন হাত ধরে স্কুলে যেত, গল্প করত, ঝগড়া করত, আবার মিলেও যেত—তার পৃথিবীও বদলে যায়। হয়তো প্রতিদিন সকালে অভ্যাসবশত পাশে তাকায়, তারপর হঠাৎ মনে পড়ে—এখন আর কেউ হাত ধরে হাঁটবে না।
একটি শিশুর প্রতি সহিংসতা শুধু একটি অপরাধ নয়—এটি সভ্যতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এটি আমাদের মানবিকতার ওপর আঘাত। আমরা যখন বলি সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে, উন্নয়ন হচ্ছে, আধুনিকতা বাড়ছে—তখন প্রশ্ন জাগে: যদি শিশুরা নিরাপদ না থাকে, তবে সেই উন্নয়নের অর্থ কোথায়?একটি শিশু নিরাপদ থাকবে—এটি কোনো দয়া নয়, এটি তার অধিকার। একটি শিশুর হাসি রক্ষা করা রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। শিশুরা ভয় নিয়ে বড় হবে না; তারা স্বপ্ন নিয়ে বড় হবে—এটাই তো স্বাভাবিক হওয়ার কথা।
আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো শুধু অপরাধ নয়, আমাদের বিস্মৃতির অভ্যাস। কিছুদিন আমরা কাঁদি, সামাজিক মাধ্যমে লিখি, প্রতিবাদ করি, ক্ষোভ প্রকাশ করি—তারপর ধীরে ধীরে অন্য খবরে ব্যস্ত হয়ে যাই। কিন্তু যাদের ঘরে শূন্যতা জন্ম নেয়, তাদের জন্য সময় থেমে থাকে।যে মায়ের কোলে আর সন্তান ফিরে আসে না, তাঁর কষ্ট কোনো সময় মুছে দিতে পারে না। যে বাবা সন্তানের মুখ মনে করে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, তাঁর কাছে প্রতিটি দিন এক নতুন শোক। সমাজ ভুলে গেলেও তারা ভুলতে পারেন না।
আমাদের থেমে নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার—আমরা কি এমন এক সমাজ চাই, যেখানে একটি শিশুর নিরাপত্তা ভাগ্যের ওপর নির্ভর করবে? যেখানে সাধারণ পরিবারের কান্না ততটা আলোচনায় আসবে না? যেখানে বিচার পাওয়ার আশাও অনিশ্চয়তায় ঢাকা থাকবে?প্রতিটি শিশুর জীবন সমান মূল্যবান। কোনো শিশুর পরিচয়, পরিবারের সামর্থ্য, সামাজিক অবস্থান—এসব দিয়ে তার নিরাপত্তার গুরুত্ব মাপা যায় না। একটি শিশুর কান্না পুরো দেশের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো শক্তিশালী হওয়া উচিত।আজ প্রয়োজন শুধু শোক নয়—সচেতনতা, দায়বদ্ধতা এবং মানবিক জাগরণ। পরিবার, প্রতিবেশী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন—সবাইকে আরও সংবেদনশীল হতে হবে। শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে আরও সতর্ক হতে হবে। কারণ প্রতিটি শিশুই নিরাপদ শৈশব পাওয়ার অধিকার নিয়ে পৃথিবীতে আসে।রামিসার মতো প্রতিটি শিশুর গল্প আমাদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কি সত্যিই জেগে আছি, নাকি শুধু ঘটনা ঘটলে কিছুক্ষণ কাঁদি, তারপর আবার নীরব হয়ে যাই?
একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়—এটি আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা। একটি ছোট্ট স্বপ্ন ভেঙে গেলে আকাশের একটি তারা নিভে যায়। আর সেই অন্ধকারের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আমাদের নেই।কারণ শিশুদের হাসি রক্ষা করতে না পারলে, ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে গর্ব করার অধিকারও একসময় আমাদের হারিয়ে