প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ৯:৫২ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ৭:১১ অপরাহ্ণ

মাসুম বেলাল কাইয়ুম, শ্যামনগর থেকে: জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় জনপদে প্রাণ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে ১০ লক্ষ বীজ রোপণের পর এবার রোপিত বীজ ও জন্ম নেওয়া চারাগাছের সুরক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ইউনিয়ন পর্যায়ের তদারকি কমিটির সদস্যদের নিয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় রোপিত বীজ থেকে জন্ম নেওয়া চারাগাছ রক্ষা, নতুন করে বৃক্ষরোপণ, বেড়া ও ঘের নির্মাণ, গাছ পাহারা দেওয়া এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) বেলা ১১টায় সাতক্ষীরার শ্যামনগরে বারসিকের উপকূলীয় আঞ্চলিক কেন্দ্রে এ সভার আয়োজন করে সংগঠিত জনসংগঠন, শ্যামনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবী অ্যাসোসিয়েশন ও গ্রিন কোয়ালিশন। সভায় সভাপতিত্ব করেন ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত ইউপি সদস্য কমলা রানী।
বারসিকের ক্যাম্পেইন অ্যান্ড নেটওয়ার্ক ফ্যাসিলিটেটর স.ম. ওসমান গনী সোহাগ এর সঞ্চালনায় সভায় স্বাগত বক্তব্যে বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শাহীন ইসলাম বলেন, উপকূল পুনরুদ্ধারে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও জনসংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এ উদ্যোগ শুধু গাছ লাগানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং উপকূলের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকার সুরক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এ উদ্যোগ দেশের বাইরেও বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যা স্থানীয় মানুষের পরিবেশ রক্ষার প্রচেষ্টাকে বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরেছে।
তিনি আরও বলেন, “বীজ রোপণ করেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। একটি বীজের অঙ্কুরোদগম থেকে চারাগাছের বেড়ে ওঠা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যত্ন ও সুরক্ষা প্রয়োজন। ঠিক নিজের গর্ভে লালন করা সন্তানের মতো। আজ যে চারাগাছটি জন্ম নিয়েছে, সেটিই আগামী দিনে পাখির আশ্রয়, জীববৈচিত্র্যের আবাস এবং উপকূলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার অংশ হয়ে উঠতে পারে। তাই কোনোভাবেই রোপিত বীজ ও চারাগাছ নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও জনসংগঠন এগিয়ে এলে বারসিকও নিজ নিজ অবস্থান থেকে সহযোগিতা করবে।”
সভায় বক্তব্য দেন ঈশ্বরীপুর ইউনিয়ন গ্রিন কোয়ালিশনের সভাপতি মো. জিল্লুর রহমান, কৈখালী ইউনিয়ন গ্রিন কোয়ালিশনের সভাপতি মো. হাবিবুর রহমান, পদ্মপুকুর ইউনিয়ন গ্রিন কোয়ালিশনের সভাপতি মো. আশরাফ হোসেন, সর্বোচ্চ বীজদাতা লতা রানী এবং আটুলিয়া এ. কাদের স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক কিশোর কুমার।
বক্তারা বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে বৃক্ষরোপণ কেবল সবুজায়নের কর্মসূচি নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উদ্যোগ। তবে বৃক্ষরোপণের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে রোপিত বীজের অঙ্কুরোদগম, চারাগাছের টিকে থাকা এবং উপযুক্ত পরিচর্যার ওপর। এ জন্য স্থানীয় মানুষের মালিকানাবোধ, নিয়মিত তদারকি ও সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও প্যানেল চেয়ারম্যান ফরিদা পারভীন, ভুরুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শাহানা মোস্তফা, পদ্মপুকুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শুক্করী রানী, মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পলাশী রানীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের তদারকি কমিটির সদস্য, গ্রিন কোয়ালিশন নেতৃবৃন্দ ও পরিবেশকর্মীরা।
সভায় ১০ লক্ষ বীজ রোপণ উদ্যোগের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, জনসম্পৃক্ততা ও অগ্রগতি নিয়ে একটি পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনা তুলে ধরেন বারসিকের কমিউনিটি ফ্যাসিলিটেটর এস. এম. জান্নাতুল নাঈম। উপস্থাপনায় উদ্যোগটির শুরু থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
মতবিনিময় সভায় উন্মুক্ত আলোচনার ভিত্তিতে রোপিত বীজ ও চারাগাছ রক্ষায় প্রতিটি ইউনিয়নে স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে রয়েছে চারাগাছের চারপাশে ঘের ও বেড়া নির্মাণ, নিয়মিত পরিচর্যা ও পাহারার ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি প্রতিটি ইউনিয়নের তদারকি কমিটি নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গিয়ে শুরু থেকেই এ উদ্যোগের সঙ্গে সংহতি প্রকাশকারী ব্যক্তি, সংগঠন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা করবে। তাঁদের অংশগ্রহণে ক্রাউডফান্ডিং বা সম্মিলিত অর্থসংগ্রহের মাধ্যমে রোপিত বীজ ও চারাগাছের সুরক্ষা এবং পরিচর্যা কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, উপকূলের প্রকৃতি পুনরুদ্ধারে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও ধারাবাহিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে বীজ রোপণের এ উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত সুফল বয়ে আনতে পারে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের মধ্যে প্রকৃতিপ্রেম, পরিবেশগত দায়িত্ববোধ ও সামাজিক নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ২৮ জুলাই শ্যামনগরের আকাশলীনা ইকো ট্যুরিজম সেন্টার-সংলগ্ন এলাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামছুজ্জাহান কনক উপকূল পুনরুদ্ধারে ১০ লক্ষ বীজ রোপণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। এ উদ্যোগের লক্ষ্য উপকূলীয় পরিবেশ পুনরুদ্ধার, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সবুজ ও প্রাণবৈচিত্র্যসমৃদ্ধ উপকূল গড়ে তোলার পথ সুগম করা।