
অনলাইন ডেস্ক : ইরানের বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ইসরায়েলি বাহিনীর তীব্র বোমাবর্ষণ এবং পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর প্রচেষ্টায় কালো ছায়া ফেলছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা এখন চরম চাপের মুখে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এ খবর জানা গেছে।
দীর্ঘদিন ধরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা পাকিস্তান নিজের নিরপেক্ষ অবস্থান কাজে লাগিয়ে একটি আলোচনার ক্ষেত্র তৈরির চেষ্টা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের কোনও সংঘাতে সরাসরি পক্ষ না হওয়া এবং দেশে কোনও মার্কিন সামরিক ঘাঁটি না থাকায় ইসলামাবাদ নিজেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরেছে। পাকিস্তানের ডি ফ্যাক্টো নেতা ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সুসম্পর্ক এবং গত দুই বছরে তেহরানের সঙ্গে ইসলামাবাদের ঘনিষ্ঠতা এই উদ্যোগকে গতি দিয়েছে।
পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, শান্তি আলোচনার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসরায়েল। গত শুক্রবার ইসরায়েল ইরানের দুটি বড় ইস্পাত কারখানা, বেসামরিক পারমাণবিক স্থাপনা এবং দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, এই হামলা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার পরিপন্থি। ট্রাম্প কূটনীতিকে সুযোগ দিতে বেসামরিক স্থাপনায় হামলা বন্ধের কথা বলেছিলেন। ইসলামাবাদের আশঙ্কা, এ ধরনের হামলা আলোচনাকে লাইনচ্যুত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোদি বলেন, ‘ইরানের মূল চাওয়া হলো যুদ্ধের অবসান এবং ভবিষ্যৎ হামলা না করার নিশ্চয়তা। তবে ট্রাম্পের কথার ওপর আস্থা রাখা কঠিন। তিনি একজন যুক্তিবাদী নন, বরং খেয়ালি।’
আলোচনার অন্যতম অমীমাংসিত বিষয় হলো হরমুজ প্রণালি। ইরান চায় এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকুক। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই দাবিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বললেও ট্রাম্প যৌথ নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কথা বলেছেন। এছাড়া তুরস্ক, মিসর, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা রবি ও সোমবার ইসলামাবাদে এক বৈঠকে বসছেন। এই চার দেশ মুসলিম বিশ্বে একটি নতুন জোট হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, যাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি বিশাল। তবে পর্দার আড়ালে সৌদি আরব ইরানের ওপর হামলা অব্যাহত রাখার পক্ষপাতী বলে গুঞ্জন রয়েছে।
তেহরান সরাসরি মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসতে নারাজ। পাকিস্তান দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের আলাদা ঘরে রেখে পরোক্ষ আলোচনার পরিকল্পনা করছে। ইরান এর আগে স্টিভ উইটকফ বা জ্যারেড কুশনারের মতো প্রতিনিধিদের ওপর অনাস্থা জানালেও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের উপস্থিতিতে সায় দিয়েছে। ভ্যান্সও সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অধিকাংশ সামরিক লক্ষ্য অর্জন করে ফেলেছে।
শান্তি আলোচনার পেছনে পাকিস্তানের নিজস্ব স্বার্থও রয়েছে। গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে ইসলামাবাদ। এর ফলে রিয়াদ যুদ্ধে জড়ালে পাকিস্তানকে তাদের পক্ষে যোগ দিতে হতে পারে। কিন্তু ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া জনগোষ্ঠীর দেশ হওয়ায় পাকিস্তান কোনোভাবেই এই যুদ্ধে জড়াতে চায় না।
এরই মধ্যে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে আরও ১০ হাজার সেনা পাঠানোর কথা ভাবছে। এই সামরিক শক্তি বৃদ্ধি শান্তি আলোচনার পথে নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে।