
মো.কামাল উদ্দিনঃচট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন কালুরঘাট ফেরিঘাট। বহু বছর ধরে লোকসান, সীমাবদ্ধতা এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও এই ফেরি সাধারণ মানুষের চলাচল সচল রেখেছে। বিশেষ করে কর্ণফুলী নদীর দুই পাড়ের মানুষের জন্য এটি কেবল একটি নৌযানভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা নয়, বরং জীবন-জীবিকা, ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত এক বাস্তবতার নাম। কিন্তু বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ ফেরিঘাটের নতুন ইজারা কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে জটিল আইনি ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি, যা নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
গত ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে একটি জাতীয় দৈনিকে কালুরঘাট ফেরিঘাটের ইজারা সংক্রান্ত টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আপত্তি উত্থাপিত হয়। টেন্ডারের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে Writ Petition No. 5977 of 2026 দায়ের করা হয়। রিট আবেদনে অভিযোগ করা হয়, টেন্ডার প্রক্রিয়ার কিছু দিক আইনগত ও প্রশাসনিকভাবে প্রশ্নের উদ্রেক করেছে, যা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।
রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে গত ১১ মে ২০২৬ তারিখে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ উক্ত টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ (Stay Order) জারি করেন। একইসঙ্গে আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি Rule Nisi জারি করে জানতে চান, কেন টেন্ডার বিজ্ঞপ্তিকে অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। আদালতের এই নির্দেশনার মাধ্যমে কার্যত টেন্ডার-সংশ্লিষ্ট পরবর্তী কার্যক্রম সাময়িকভাবে প্রশ্নের মুখে পড়ে এবং প্রশাসনের প্রতি সতর্ক অবস্থান গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।
ইজারাদার প্রতিষ্ঠান আমিরিন অ্যান্ড ব্রাদার্স (Amrin & Brothers)-এর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আদালতের আদেশের সার্টিফায়েড কপি যথাসময়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়সহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক দপ্তরে দাখিল করা হয়েছে। ২০ মে ২০২৬ তারিখে লিখিত আবেদনপত্রের মাধ্যমে নির্বাহী প্রকৌশলী, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, রহমতগঞ্জ, চট্টগ্রাম বরাবর আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয় যাতে আদালতের নির্দেশনা কার্যকর রেখে টেন্ডার-সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম স্থগিত করা হয় এবং বর্তমান ফেরি পরিচালনা স্বাভাবিক রাখা হয়।
আবেদনে স্পষ্টভাবে তিনটি বিষয় উল্লেখ করা হয়—প্রথমত, প্রকাশিত টেন্ডারের অধীনে পরবর্তী সব প্রশাসনিক কার্যক্রম অবিলম্বে স্থগিত রাখতে হবে; দ্বিতীয়ত, আদালতের স্থগিতাদেশের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তর ও কর্মকর্তাকে অবহিত করতে হবে; তৃতীয়ত, আদালতের নির্দেশনা বলবৎ থাকা অবস্থায় চলমান ফেরি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে হবে, যাতে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না হয়।
এদিকে ইজারাদার পক্ষের অভিযোগ, আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বাস্তব পরিস্থিতিতে কিছু প্রশাসনিক কার্যক্রমে অসামঞ্জস্য দেখা গেছে এবং নির্বাহী প্রকৌশলী মোসলেম উদ্দিন আদালতের আদেশের যথাযথ প্রতিফলন ঘটাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এ অভিযোগ এখনো কোনো আদালত, তদন্ত সংস্থা বা সরকারি প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি। এটি অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছাড়া বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া কঠিন।
এই প্রেক্ষাপটে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য দৈনিক টুরিস্ট, চট্রল চিত্র, দৈনিক ভোরের আওয়াজ, সময়-এর আলো এবং কথা টিভি-এর প্রতিনিধিরা নির্বাহী প্রকৌশলী মোসলেম উদ্দিনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেন বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করেননি বলে জানানো হয়। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য বা ব্যাখ্যা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মতামত পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও ভারসাম্যপূর্ণভাবে মূল্যায়ন করা সহজ হতো বলে অনেকেই মনে করছেন।অন্যদিকে, ইজারাদার প্রতিষ্ঠান আমিরিন অ্যান্ড ব্রাদার্সের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এই জটিলতার কারণে তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। ফেরি পরিচালনার জন্য পূর্ব থেকে কর্মচারীদের বেতন, নৌযানের রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি, প্রশাসনিক খরচ, অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয় বহন করতে হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা ও আইনি জটিলতার কারণে প্রত্যাশিত কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় তারা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন।
ইজারাদার পক্ষের ভাষ্যমতে, আদালতের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে তারা আইনের শাসন অনুসরণ করেই এগোতে চান। তাদের দাবি—আদালতের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা অবস্থায় যেকোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত আইনগত দিক পর্যালোচনা করা এবং আদালতের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা। এতে একদিকে যেমন প্রশাসনিক জটিলতা কমবে, অন্যদিকে আইনের শাসনের প্রতি জনআস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের আদেশকে পাশ কাটিয়ে বা তা নিয়ে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ভবিষ্যতে তা আরও বড় ধরনের আইনি জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। কারণ আদালতের নির্দেশনা প্রতিপালন শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়—এটি রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং বিচার বিভাগের প্রতি সম্মানের প্রশ্নও।সবশেষে প্রশ্ন উঠছে—যেখানে আদালত বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দিয়েছেন, সেখানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ কি যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করছে? প্রশাসনের দায়িত্ব কি আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে আরও সক্রিয় হওয়া নয়? আর জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ ফেরিঘাটের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কি দীর্ঘায়িত হওয়া উচিত?
কালুরঘাট ফেরিঘাট কেবল একটি ইজারা বা টেন্ডারের বিষয় নয়; এটি হাজারো মানুষের দৈনন্দিন জীবনপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি প্রত্যাশা—আদালতের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন, আইনের শাসন মেনে চলা, নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা এবং আইনসম্মত ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়েই এ সংকটের একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করা হবে।