
পুলিশ সদর দপ্তরের অশ্রুভেজা খোলা চিঠি—রাষ্ট্র, বিবেক, ক্ষমতা ও ইতিহাসের কাছে এক রক্তাক্ত জবানবন্দি
সম্পাদকীয় | দৈনিক টুরিস্ট পত্রিকা | চট্রল চিত্র | দৈনিক ভোরের আওয়াজ
মো. কামাল উদ্দিন : রাষ্ট্রের ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত আসে, যখন শব্দ আর শুধুই শব্দ থাকে না—তা হয়ে ওঠে দীর্ঘশ্বাস, কান্না, অভিশাপ এবং ভবিষ্যতের জন্য রেখে যাওয়া এক ভয়ংকর সতর্কবার্তা। সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে পৌঁছানো নির্যাতিত, কারাবন্দি, সাময়িক বরখাস্ত ও হয়রানির শিকার একদল পুলিশ কর্মকর্তার খোলা চিঠিটি ঠিক তেমনই এক সময়ের দলিল।
এই চিঠি কেবল কয়েকজন অভিযুক্ত কর্মকর্তার আত্মপক্ষ সমর্থন নয়। এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অভ্যন্তরে জমে থাকা ভয়, অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক ব্যবহার, ক্ষমতার নিষ্ঠুরতা এবং সহকর্মীর হাতে সহকর্মীর অপমানিত হওয়ার এক হৃদয়বিদারক ইতিহাস।
চিঠিটি পড়লে মনে হয়—লোহার গরাদের ওপাশ থেকে কিছু ক্লান্ত মানুষ কাঁদতে কাঁদতে বলছে,
“আমাদের অপরাধ কি শুধু আদেশ পালন করা?”
এই প্রশ্ন কেবল পুলিশের নয়।
এই প্রশ্ন রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরের।
এই প্রশ্ন সেইসব মানুষের, যারা ক্ষমতার চাকা ঘোরাতে গিয়ে একসময় নিজেরাই সেই চাকায় পিষ্ট হয়ে যায়।
চিঠির শুরুতেই যে আর্তনাদ উচ্চারিত হয়েছে, তা যেকোনো সংবেদনশীল মানুষের হৃদয় নাড়িয়ে দেয়—
“আজ আপনি যে চেয়ারে বসে আছেন, একদিন সেখানে আমরাই ছিলাম...”
একসময় যারা থানার ওসি ছিলেন, জেলার দায়িত্বে ছিলেন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষায় দিনরাত দায়িত্ব পালন করেছেন—আজ তারাই হাতকড়া পরা আসামি। যাদের সামনে স্যালুট করা হতো, আজ তারা আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের জন্য কাঁদছেন। কী নির্মম এই সময়! কী ভয়াবহ এই পরিণতি!
ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস বাংলাদেশে নতুন নয়। কিন্তু প্রতিবারই দেখা যায়—ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় আনুগত্যের ভাষা, বদলে যায় দায়-দায়িত্বের সংজ্ঞা। গতকাল যারা রাষ্ট্রের বিশ্বস্ত কর্মকর্তা ছিলেন, আজ তারাই রাষ্ট্রের চোখে অভিযুক্ত। গতকাল যাদের নির্দেশ পালন করা হয়েছিল রাষ্ট্রীয় কর্তব্য হিসেবে, আজ সেই নির্দেশই হয়ে উঠেছে অপরাধের সাক্ষ্য।
এই বাস্তবতার মধ্যেই চিঠিতে উঠে এসেছে বহুল আলোচিত “চেইন অফ কমান্ড”-এর প্রসঙ্গ। পুলিশ কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তাঁরা কেবল ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পালন করেছেন। প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রযন্ত্রে কর্মরত একজন কর্মকর্তা কতটুকু স্বাধীন? আদেশ অমান্য করলে শাস্তি, আর আদেশ পালন করলেও আজ কারাগার—তাহলে তাদের সামনে পথ কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।
কারণ রাষ্ট্র যদি কেবল দুর্বলদের বলির পাঁঠা বানায়, তবে একসময় পুরো ব্যবস্থার ভেতরই জন্ম নেয় ভয় ও অবিশ্বাসের সংস্কৃতি।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় চিঠির সেই অংশ, যেখানে সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে—
“কাক কাকের মাংস খায় না, কিন্তু পুলিশ কেন নিজের ভাইয়ের বুকে কুড়াল মারছে?”
এই একটি বাক্য যেন পুরো বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ভাঙনের প্রতীক।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা যখন আরেকজন পুলিশ কর্মকর্তার দিকে তাকিয়ে নিরাপত্তা নয়, আতঙ্ক অনুভব করেন—তখন বুঝতে হবে সংকট কেবল প্রশাসনিক নয়, এটি নৈতিক সংকট। ইউনিফর্ম একসময় ছিল গর্বের প্রতীক।
আজ সেই ইউনিফর্মই যেন ভয়, সন্দেহ ও প্রতিশোধের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্ষমতার করিডোরে যারা আজ নিরাপদ মনে করছেন নিজেদের, তাদেরও মনে রাখা উচিত—ইতিহাস কখনো এক জায়গায় স্থির থাকে না। ক্ষমতা নদীর স্রোতের মতো; আজ এখানে, কাল অন্য কোথাও। অথচ অন্যায়ের নথি, মিথ্যা মামলা, সাজানো চার্জশিট এবং নিরপরাধ মানুষের কান্না ইতিহাসের পাতায় থেকে যায়।
এই চিঠির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—এটি পুলিশের ভেতরে আস্থার সংকটকে নগ্নভাবে প্রকাশ করেছে। জনগণ যখন বিপদে পড়ে, তখন পুলিশকে ডাকে। কিন্তু পুলিশ যখন নিজেরাই বিপদে পড়ে, তখন তারা কার কাছে যায়?
চিঠিতে লেখা হয়েছে— “পুলিশ সবার জন্য হলেও পুলিশের জন্য কেউ না।”
এই বাক্যের ভেতরে রয়েছে এক সীমাহীন একাকিত্ব।
একজন পুলিশ সদস্য হয়তো জীবনের সেরা সময়গুলো কাটিয়েছেন ডিউটিতে। ঈদে পরিবারকে সময় দিতে পারেননি, সন্তানকে নিয়ে ঘুরতে যেতে পারেননি, রাতের পর রাত জেগে দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ আজ সেই মানুষটিই হয়তো কারাগারের অন্ধকার কক্ষে বসে ভাবছেন—রাষ্ট্র কি তাকে শুধুই ব্যবহার করেছে?
এই প্রশ্ন ভয়ংকর।
কারণ রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ভেঙে গেলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় রাষ্ট্রেরই।
আজ যারা বন্দি, তারা সবাই নির্দোষ—এমন দাবি করা যাবে না। আবার সবাই অপরাধী—এ কথাও বলা যায় না। কিন্তু ন্যায়বিচারের মূল শর্ত হলো—বিচার হতে হবে নিরপেক্ষ, প্রতিহিংসামুক্ত এবং মানবিক। যদি বিচার রাজনৈতিক প্রতিশোধের অস্ত্রে পরিণত হয়, তবে সেখানে সত্য হারিয়ে যায়, আর জন্ম নেয় নতুন অন্যায়।
পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক ব্যবহারের সংস্কৃতি বহু পুরোনো। ক্ষমতায় যে আসে, সে-ই বাহিনীকে নিজের মতো ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী—রাজনীতিবিদেরা সময়ের সঙ্গে বদলে যায়, সরকার পরিবর্তন হয়, পতাকা বদলায়; অথচ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষত থেকে যায় বহু বছর। সেই ক্ষতের দাগ বহন করে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
আজ যে পুলিশ কর্মকর্তা কারাগারে, হয়তো কয়েক বছর আগেও তিনি রাষ্ট্রের হয়ে জীবন বাজি রেখে দায়িত্ব পালন করেছেন। হয়তো কোনো সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়েছেন, হয়তো কোনো রাজনৈতিক সহিংসতা ঠেকাতে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছেন। অথচ আজ তিনি একা। তার পাশে নেই রাষ্ট্র, নেই সহকর্মী, নেই সেই ক্ষমতাবান মানুষগুলো, যাদের নির্দেশ একসময় তিনি অন্ধভাবে পালন করেছিলেন।
এ যেন ক্ষমতার এক নির্মম খেলা—
ব্যবহার শেষে মানুষকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার খেলা।
এই চিঠি ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
রাষ্ট্র যদি তার বাহিনীগুলোকে কেবল রাজনৈতিক হাতিয়ার বানায়, তবে একসময় সেই বাহিনীর ভেতর থেকেই জন্ম নেবে ভয়াবহ হতাশা, ক্ষোভ ও বিভক্তি। আর যখন আইনরক্ষকদের মনোবল ভেঙে যায়, তখন পুরো রাষ্ট্রই দুর্বল হয়ে পড়ে।
আজ প্রয়োজন প্রতিহিংসা নয়—ন্যায়বিচার। প্রয়োজন প্রতিশোধ নয়—সত্য উদঘাটন।
প্রয়োজন সহকর্মীর বিরুদ্ধে সহকর্মীকে দাঁড় করানো নয়—মানবিক রাষ্ট্র গঠন।
কারণ মানুষ ভুলে যায় না।
কারাগারের অন্ধকারে ঝরে পড়া অশ্রু একদিন ইতিহাসের ভাষা হয়ে ওঠে।
অন্যায়ের প্রতিটি দলিল একদিন বিবেকের আদালতে হাজির হয়।
হয়তো বহু বছর পর কোনো তরুণ পুলিশ কর্মকর্তা এই চিঠি পড়বে।
হয়তো কোনো গবেষক রাষ্ট্রের ইতিহাস লিখতে গিয়ে এই দলিলের কাছে ফিরে আসবেন।
হয়তো কোনো মা তার পুলিশ সন্তানকে বুকে জড়িয়ে কাঁদবেন—এই ভেবে যে, ইউনিফর্মের আড়ালে থাকা মানুষটিও একদিন অসহায় হয়ে পড়তে পারে।
আর তখন ইতিহাস হয়তো লিখবে—
একটি সময় ছিল, যখন রাষ্ট্রের ভেতরে মানুষ মানুষকে ভয় পেত।
একটি সময় ছিল, যখন ইউনিফর্মের ভেতরে কান্না লুকিয়ে রাখা হতো।
একটি সময় ছিল, যখন সহকর্মীর হাতেই সহকর্মী অপমানিত হতো।
আর সেই সময়ের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দলিলগুলোর একটি ছিল—
“আজ আমি কাঠগড়ায়, কাল হয়তো আপনি।”